| ছেলেবেলা থেকেই স্বদেশী গান এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত
গাইতে তিনি খুব ভালোবাসতেন৷ আবার সবুজ ঘাসে দৌড়
ঝাঁপ ও খেলাধুলা শিশু বয়সে তাঁর খুব প্রিয় ছিল ৷
সাথীদের নিয়ে প্রতিদিন বিকেল বেলা খেলাধুলা
করতেন৷ প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর বুদ্ধিদীপ্ত এই মেয়েটি
স্কুল জীবন থেকেই ছিলেন দেশ ও সমাজ সচেতন৷
পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি বই ও পত্রিকা পড়তেন৷ ফলে
সমাজ, রাজনীতি ও ব্রিটিশ সরকারের শোষণ বিষয়ে
ছেলেবেলা থেকেই তিনি স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছেন৷ তিনি
যখন প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন তখন দেশজুড়ে
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের আগুন
জ্বলছে৷ সপ্তম শ্রেনীর ছাত্রী থাকাকালে ব্রিটিশ
সরকারের নিষিদ্ধঘোষিত পত্রিকা পড়ার সাহস তাঁর
হয়েছিল৷
পরবর্তীতে নারী শিক্ষা, প্রান্তিক ও বঞ্চিত নারীদের
সংগঠিত করা, নানকার নারীদের অধিকার আদায়ের
সংগ্রামসহ আরো বহু ক্ষেত্রে এই অসামান্যা নারী কাজ
করেছেন৷ ব্রিটিশ-বিরোধী-আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলন,
ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
সংগ্রামসহ দেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে তিনি ছিলেন
সক্রিয়৷
এই সাহসী সংগ্রামী নারী হলেন হেনা দাস৷ আজও যিনি
সাধারণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন৷
বাংলার নারী জাগরণে যে ক'জন নারী তাঁদের সময়ের
গণ্ডি পেরিয়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন হেনা দাস
তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ হেনা দাস তাই এক সাহসী
যোদ্ধার নাম- এক প্রেরণা ও আপোষহীন ব্যক্তিত্বের
নাম৷
১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হেনা দাস সিলেটে
জন্মগ্রহণ করেন৷ তাঁর পিতা সতীশচন্দ্র দত্ত একজন
স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন৷ হেনা দাসের মা মনোরমা
দত্ত ছিলেন চুনারুঘাট থানার নরপতি গ্রামের জমিদার
জগত্চন্দ্র বিশ্বাসের বড়ো মেয়ে৷ পাঁচ ভাই ও দুই
বোনের মধ্যে হেনা দাস সর্ব কনিষ্ঠ৷ বর্তমানে তাঁর
ভাই বোনরা কেউই বেঁচে নেই৷
সপ্তম শ্রেনীতে পড়ার সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন
আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন৷ মাঝে মাঝে
বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস করতেন৷ হাই স্কুল পার হবার
আগেই হেনা দাস স্থানীয় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক
কর্মকাণ্ডে জড়িত হন৷ স্থানীয় অনেক রাজনীতিক ও
গণ্যমান্য ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে হেনাদাস
সাম্রাজ্যবাদের শাসন ও শোষণ সম্পর্কে ধারণা পান৷
বুঝতে পারেন দেশের জন্য কিছু করতে হবে৷ বিশেষ করে
নারী সমাজের জন্য তিনি সব সময়ই কিছু একটা করার
তাগিদ অনুভব করতেন৷
ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য ত্রিশ দশক ছিল বিক্ষোভ,
আন্দোলন ও বিদ্রোহের সূচনাকাল৷ হেনা দাসের বাড়ি
ছিল সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থল পুরান-লেন পাড়ায় ৷
বাড়ির কাছে ঐতিহাসিক গোবিন্দ পার্ক ছিল মূলত
সমাবেশের কেন্দ্র ৷ ফলে তিনি কাছ থেকে শ্লোগান,
মিছিল ও সভা-সমাবেশ দেখেছেন৷ দেখেছেন স্বদেশিদের
ওপর বর্বর পুলিশি নির্যাতন৷ এসব তাঁর মনের গভীরে
দাগ কেটেছিল৷ এভাবেই হেনা দাসের মনে ধীরে ধীরে
ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জন্ম নেয়৷ ফলে কৈশোর থেকেই
তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন৷
সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণীতে
ভর্তির মাধ্যমে হেনা দাসের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু
হয়৷ ১৯৪০ সালে ঐ স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাশ করেন
এবং ১৯৪২ সালে তিনি প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস
করেন৷ এরপর কয়েক বছর রাজনীতির জন্য লেখাপড়া বন্ধ
ছিল৷ নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে দীর্ঘদিন পর
তিনি আবার পড়াশুনা শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সালে বিএ
পাস করেন৷ শিক্ষকতা করার সময় তিনি ময়মনসিংহ
মহিলা ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি লাভ করেন৷
এরপর ১৯৬৫ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম
হয়ে এমএ প্রথমপর্ব এবং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে
চতুর্থ হয়ে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি লাভ করেন৷
হেনা দাস যখন পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং
পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন৷ সে সময়
তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ তিনি মেয়েকে বিয়ে করার
অনুরোধ করেন৷ অসুস্থ বাবার অনুরোধ রাখতে তিনি বিয়ের
জন্য রাজি হন৷ বিয়ে ঠিক হয় পার্টির সক্রিয় কর্মী
কমরেড রোহিনী দাসের সাথে৷ তিনি ছিলেন সিলেট
জেলা কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা৷
রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় বর ও কনেকে
গোপনে কলকাতায় চলে যেতে হয় এবং ১৯৪৮ সালের ২৮
জুন ঘরোয়াভাবে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে
সম্পন্ন হয়৷ বিয়ের পর পার্টির নির্দেশে হেনা দাস ও
রোহিনী দাস অনেকদিন আত্মগোপন করে ছিলেন৷
বিয়ের পর স্বামীর সাথে অন্য দশজনের মতো সংসার করা
হয়ে ওঠেনি হেনা দাসের৷ সংগ্রামী নারী হেনা দাসকে
পার্টির গোপন আস্তানায় বা বিশ্বস্ত কোনো কর্মীর
বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে৷ এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে
হেনা দাসের প্রথম মেয়ে বুলু জন্মগ্রহণ করে৷ বুলুকে
নিয়ে এভাবে আত্নগোপন করে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব
হচ্ছিল না৷ উপায়ান্তর না দেখে ১৯৫৬ সালে হেনা দাস
চার বছরের মেয়ে বুলুকে নিয়ে কলকাতায় পিসীর বাড়িতে
যান৷ কিন্তু সেখানেও তিনি স্থির হতে পারেননি৷
অবশেষে দীর্ঘ দশ বছরের আত্মগোপনীয়তা থেকে বেরিয়ে
তিনি অবশেষে ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকার 'গেণ্ডারিয়া
মনিজা রহমান বালিকা বিদ্যালয়ে' শিক্ষকতার চাকরি
নেন৷ সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ১১৫ টাকা৷ কিন্তু
স্বামী রোহিনী দাস তখনো আত্মগোপনে৷ ছুটি পেলে বছরে
দু'একবার হেনা দাস বুলুকে নিয়ে সিলেটে যেয়ে স্বামীর
সাথে দেখা করতেন৷ বিয়ের ১৩ বছরের মাথায় হেনা
দাস ১৯৬১ সালে 'নারায়ণগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে'
প্রধান শিক্ষিকা পদে যোগদান করেন৷ ওই স্কুল থেকে
তাঁর নামে একটি কোয়ার্টার বরাদ্দ করা হয়৷ এই
কোয়ার্টারেই তিনি নিজস্ব সংসার গোছানোর সুযোগ পান৷
এরপর 'মহাখালী ওয়ারলেস স্টেশন স্কুলে'-ও তিনি
কিছুদিন প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন৷ প্রায়
তিন যুগ শিক্ষকতার পর হেনা দাস ১৯৮৯ সালে শিক্ষকতা
পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন৷
'নারায়ণগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের' কোয়ার্টারে থাকার
সময় তাঁর স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হেনা
দাসের কোয়ার্টারে চলে আসেন৷ এই অসুস্থতার কারণে
তাঁর স্বামী আর রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেননি৷
১৯৬৫ সালে হেনা দাসের দ্বিতীয় মেয়ে চম্পা জন্মগ্রহণ
করে৷ হেনা দাস মেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত ও প্রগতিশীল
সমাজের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন৷ বড় মেয়ে
দীপা ইসলাম (বুলু) স্বনামধন্য গাইনোকোলোজিস্ট এবং
ছোট মেয়ে চম্পা জামান কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি
অর্জন করেছেন৷
হেনা দাসের স্বামী রোহিনী দাস সেই যে অসুস্থ হলেন
আর সুস্থ হতে পারেননি৷ এজন্য তাঁকে ঘরেই থাকতে হতো,
কোনো কাজে সক্রিয় হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না৷
দীর্ঘ দিন তিনি অসুখে ভোগার পর ১৯৮৫ সালের শেষে
তিনি আরো অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন৷ ১৯৮৭
সালের ৩ জানুয়ারি রোহিনী দাস পরলোকগমন করেন৷
স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাজার স্মৃতি নিয়ে
হেনা দাস গর্বিত৷
হেনা দাস নবম-দশম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় নিখিল
ভারত ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে সক্রিয়ভাবে
কাজ করেন৷ ১৯৪০ সালে মাধ্যমিক পাসের পর তিনি
সুরমা ভ্যালি গার্লস্ স্টুডেন্টস্ কমিটি গঠনের কাজে যুক্ত
হন৷ ছাত্রদের থেকে পৃথকভাবে ছাত্রী সংগঠন গড়ে
তোলার পরিকল্পনায় তিনি সফল হন এবং ছাত্রী সমাজকে
সফলভাবে সংগঠিত করেন৷ ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে
হেনা দাস ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ
করেন৷ ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে ভারতের কমিউনিস্ট
পার্টি আইনসঙ্গত বলে ঘোষিত হয়৷ তখন দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধ চলছিল৷ এ সময় সারা দেশে অর্থনৈতিক সঙ্কট
বাড়তে থাকে৷ দেখা দেয় ভয়ঙ্কর মন্বন্তর (বাংলা
১৩৫০)৷ খাদ্যাভাবে বাংলার মানুষ তখন দিশেহারা৷
প্রতিদিন শত শত মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে৷ সবচেয়ে
খারাপ অবস্থায় পড়েছিল নারী ও শিশুরা৷
ওই অবস্থায় নারী সমাজকে সংগঠিত ও সচেতন করার
প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করলেন হেনা দাস৷ আর তখনই
সারা বাংলাদেশে গড়ে উঠলো নতুন নারী সংগঠন 'মহিলা
আত্মরক্ষা সমিতি'৷ সিলেট জেলায় হেনা দাসের নেতৃত্বে
গড়ে ওঠে 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'৷ রাজনৈতিক,
সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে দলমত
নির্বিশেষে সমস্ত নারীকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল 'মহিলা
আত্মরক্ষা সমিতি'র লক্ষ্য৷ পার্টি কর্মী হিসেবে এবং
'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'র নেত্রী হিসেবে হেনা দাস
প্রথমবারের মতো গ্রামে গেলেন৷ শহরের উচ্চবিত্ত
পরিবারের শিক্ষিত কিশোরী মেয়ে হয়ে গ্রামীন জীবন ও
কৃষক মেয়েদের সাথে একাত্ম হয়ে তাদের নিয়ে একটি
সংগঠন গড়ে তোলাটা তাঁর জন্য একটা কঠিন সংগ্রাম
ছিল৷ গ্রামে গিয়ে গ্রমীণ নারীসমাজের পশ্চাত্পদতার
সাথে হেনা দাসের প্রথম পরিচয় ঘটে৷ তখন থেকেই
তিনি নারীদের নিয়ে কাজ করার কথা চিন্তা করেন৷
গ্রামের নারীদের সংগঠিত করার পথে তাঁর প্রধান বাধা
ছিল অশিক্ষা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি
সর্বোপরি সামন্ততান্ত্রিক শোষণ৷ ওই বাধা দূর করে
গ্রামের নারীদের সচেতন করে তুলতে প্রয়াসী হন হেনা
দাস৷ কয়েক বছরের অবিরাম প্রচেষ্টায় সিলেট জেলায়
'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি' সত্যিকারের সাংগঠনিক রূপ
লাভ করেছিল৷ নারী আন্দোলনের পাশাপাশি 'গণনাট্য'
আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন হেনা দাস৷ এসময় সারা
ভারতে 'গণনাট্য সংঘ' তার শাখা বিস্তার করেছিল৷
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের উদ্যোগে সিলেট শহরেও 'সুরমা
ভ্যালী কালচার স্কোয়াড' নামে একটি 'গণনাট্য সংঘ'
আত্মপ্রকাশ করেছিল৷ গণনাট্য আন্দোলন সংস্কৃতিকে
রূপান্তরিত করেছিল সংগ্রামের এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার
হিসেবে৷ ওই নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রচার গণমানুষের
মধ্যে নতুন চেতনার বিকাশ ঘটায়৷ সাধারণ মানুষ
দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ হয় এর মাধ্যমে৷ ১৯৪৬ সালের
সংগ্রামের জোয়ারের মধ্যেই নেত্রকোণা জেলায় 'নিখিল
ভারত কৃষক সম্মেলন' হয়েছিল৷ ওই সম্মেলনে লক্ষাধিক
সংগ্রামী জনতার সামনে 'গণনাট্য সংঘে'র শিল্পী
হিসেবে প্রথম ও শেষবারের মতো সঙ্গীত পরিবেশন করেন
হেনা দাস; কারণ ১৯৪৮ সালের পর থেকে গোপন জীবন
শুরু হলে তাঁর গানের কন্ঠও স্তব্ধ হয়ে যায়৷
১৯৪৬ সালে সিলেট জেলায় ছাত্র আন্দোলনকে আরো
জোরদার করার জন্য বিশেষ করে ছাত্র সমাজের মধ্যে
ছাত্র ফেডারেশনকে প্রসারিত করার জন্য হেনা দাসকে
আবার ছাত্র ফ্রন্টে নিয়ে আসা হয়৷ ১৯৪৮ সালে পূর্ব
পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন গড়ে তোলার প্রথম প্রয়াস
গ্রহণ করা হয় ময়মনসিংহ জেলায় এবং সেখানেই হয়
প্রথম সম্মেলন৷ হেনা দাস ওই সম্মেলনে পূর্ব-পাকিস্তান
ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক
নির্বাচিত হন৷ এরপর তিনি আত্মগোপন অবস্থায় গ্রামে
চলে যান৷ সিলেট জেলায় কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য অত্যন্ত
গৌরবময়৷ স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি গড়ে
উঠেছিল ব্যাপক কৃষক আন্দোলন, প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন
আন্দোলন, খাজনা বন্ধ আন্দোলন, গাছ কাটার অধিকারসহ
কৃষকদের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলন৷ ওইসব
আন্দোলনের ঐতিহ্য ও শক্তি বহন করে গড়ে উঠেছিল
নানকার আন্দোলন৷ নানকার মেয়েদের সচেতন করে তোলা
ও আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন হেনা
দাস৷ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হেনা দাস
নানকার আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত ওই এলাকায় থাকতে
পারেননি৷ চিকিত্সার জন্য শহরে চলে এসেছিলেন৷
কিন্তু শহরে তখন হেনা দাসের মতো সংগ্রামী নারীদের
খুব কম বাড়িতেই আশ্রয় মিলতো৷ আত্মগোপন অবস্থায় তখন
নিরাপদ আশ্রয়ের প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল৷
কিছুদিন পর যখন শহরতলিতে কমিউনিস্ট পার্টির আস্তানা
তৈরি হলো, তখন তিনি সেখানে চলে গেলেন৷ স্থির হলো
ওই আস্তানাকে কেন্দ্র করে চা বাগান এলাকায় গিয়ে
তিনি কাজ করবেন৷
হেনা দাস ৫২'র ভাষা আন্দোলনের সময় আত্মগোপন
অবস্থায়ও রাজপথে আন্দোলনরত নারীদের সাথে যোগাযোগ
রক্ষা করে তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা
করেন৷ ১৯৬০-৬২ সালে সারা দেশে শিক্ষা আন্দোলন শুরু
হলে তিনি শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ
করেন৷ হেনা দাস ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় 'মহিলা
সংগ্রাম পরিষদ' গঠন করেন৷ এসময় তাঁর কর্ম এলাকা
ছিল প্রধানত নারায়ণগঞ্জ৷ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা
যুদ্ধের সময় তিনি কোলকাতায় চলে যান৷ সেখানে তিনি
সকল স্তরের উদ্বাস্তু শিক্ষকদের নিয়ে 'উদ্বাস্তু শিক্ষক
সমিতি' গড়ে তোলেন৷ তিনি এসব শিক্ষকদের ও উদ্বাস্তু
শিবিরের অন্যান্য নারীদের জন্য ত্রাণ, আশ্রয়,
চিকিত্সাসহ বিভিন্ন সেবায় নিয়োজিত ছিলেন৷ এছাড়া
এ সমিতির মাধ্যমে উদ্বাস্তু শিবিরে ৫০টি ক্যাম্প স্কুল
স্থাপন করে শিশু-কিশোরদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন৷
এছাড়াও তিনি সে সময় কলকাতা মহিলা পরিষদের রিলিফ
আন্দোলন ও নারীদের সংগঠিত করতে ব্যস্ত ছিলেন৷ ১৯৯০
সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও তিনি বাংলাদেশ
মহিলা পরিষদ ও শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা
রাখেন৷
বেসরকারি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের
অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সংহতি প্রকাশ করেন৷
'পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষক সমিতি' যা দেশ স্বাধীনের পর
হয় 'বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি' -হেনা দাস এই শিক্ষক
সমিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন৷ শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার
আদায়ের জন্য তিনি এই শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে সব
সময়ের জন্য সক্রিয় ছিলেন৷ তিনি ১৪ বছর শিক্ষক
সমিতির জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন৷
১৯৭৭ সালে শিক্ষকদের নিয়ে আন্দোলন করার জন্য হেনা
দাস তিন দিন জেলে বন্দি থাকেন৷ তিনি জানান, এই
তিন দিন বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর মারাত্মকভাবে
নির্যাতন করা হয়৷ এরপর ১৯৮৬ সালে শিক্ষকদের নিয়ে
আন্দোলন শুরু করলে তত্কালীন স্বৈরচারী সরকার এই
আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং আবারো হেনা দাসকে
বন্দি করা হয়৷ ১ মাস ৮ দিন তিনি চট্টগ্রাম
কারাগারে বন্দি থাকেন৷ সব বাধা উপেক্ষা করে
অব্যাহতভাবে তিনি অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে
গেছেন৷
রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি 'রোকেয়া পদকে' সম্মানিত
হয়েছেন৷ এছাড়া সুনামগঞ্জ পৌরসভা, ঘাতক দালাল
নির্মূল কমিটি, ঢাকেশ্বরী মন্দির, নারায়ণগঞ্জ
সাংস্কৃতিক জোট, আহমেদ শরীফ ট্রাস্টসহ তিনি বহু
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পেয়েছেন৷
রাজশাহীর একটি প্রতিষ্ঠান হেনা দাসের ওপর একটি
অডিওভিজু্য়াল ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে৷ নারীপক্ষ ও
নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা থেকে প্রকাশিত দুটি বই-এ হেনা
দাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশিত হয়েছে৷
হেনা দাস কেবল একজন সাহসী, সংগ্রামী ও সাংস্কৃতিক
ব্যক্তিত্বই নন, তিনি একজন কলম সৈনিকও বটে৷
ইতিমধ্যে হেনা দাসের অর্ধডজন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে৷
বইগুলো হলো: উজ্জ্বল স্মৃতি, শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবন,
স্মৃতিময় দিনগুলো, নারী আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টির
ভূমিকা, স্মৃতিময়-'৭১ এবং চার পুরুষের কাহিনী৷ হেনা
দাস তাঁর আত্মজীবনী লিখেছেন 'চার পুরুষের কাহিনী'
শিরোনামের বইটিতে৷ এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে
হেনা দাসের লেখা বিভিন্ন কলাম ও প্রবন্ধ ছাপা
হয়েছে৷ এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে 'প্রবন্ধ
সংকলন' শিরোনামে আরেকটি বই৷ সাহিত্য প্রকাশের
মফিদুল হক 'মাতৃমুক্তি পথিকৃত' নামে তাঁর জীবনের উপর
একটি বই প্রকাশ করেছেন৷
এখনও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নারী
উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য৷ বাংলাদেশ মহিলা
পরিষদের জন্মলগ্ন ১৯৭০ সাল থেকে হেনা দাস এর সাথে
জড়িত৷ কবি সুফিয়া কামাল-এর পরলোকগমনের পর ২০০০
সালের শুরুতে হেনা দাস বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের
সভানেত্রী নিযুক্ত হন৷ আজও তিনি বাংলাদেশ মহিলা
পরিষদেও সভানেত্রী পদে আছেন এবং নারী উন্নয়নে
ভূমিকা রেখে চলেছেন৷ নারী উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি
রাজনৈতিক আন্দোলনসহ শিক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত
আছেন৷ হেনা দাস বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট
পার্টি (সিপিবি)-এর কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের
সদস্য এবং বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির
উপদেষ্টা৷ মৌলবাদ ও সামপ্রদায়িকতা বিরোধী দক্ষিণ
গণসম্মিলনের একজন অন্যতম সদস্য৷
তিনি ২০০৯ সালের ২০ জুলাই মারা যান। সারাজীবন
তিনি নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনসহ
বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন৷ যেখানেই
কোনো অন্যায়, অবিচার দেখেছেন
সেখানেই তাঁর প্রতিবাদী কন্ঠ শোনা গেছে৷ আর তাই
হেনা দাসের নাম বাংলাদেশের মানুষ তথা নারী
সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সবসময়৷
সংক্ষিপ্ত জীবনী:
জন্ম: ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হেনা দাস সিলেটে
জন্মগ্রহণ করেন৷
বাবা-মা: তাঁর বাবার নাম সতীশচন্দ্র দত্ত৷ আর মার
নাম মনোরমা দত্ত৷ পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হেনা
দাস সর্ব কনিষ্ঠ৷ বর্তমানে তাঁর ভাই বোনরা কেউই
বেঁচে নেই৷
পড়াশুনা: সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিশু
শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে হেনা দাসের প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষা শুরু হয়৷ ১৯৪০ সালে ঐ স্কুল থেকেই মাধ্যমিক
পাশ করেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি প্রথম বিভাগে
উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন৷ এরপর কয়েক বছর রাজনীতির
জন্য লেখাপড়া বন্ধ ছিল৷ নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা
কাটিয়ে দীর্ঘদিন পর তিনি আবার পড়াশুনা শুরু করেন
এবং ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন৷ শিক্ষকতা করার সময়
তিনি ময়মনসিংহ মহিলা ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড
ডিগ্রি লাভ করেন৷ এরপর ১৯৬৫ সালে প্রাইভেট
পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায়
দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এমএ প্রথমপর্ব এবং ১৯৬৬
সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ হয়ে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি
লাভ করেন৷
বিয়ে ও ছেলেমেয়ে: হেনা দাস যখন পুরোপুরি
রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করছেন৷ সে সময় তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন৷
তিনি মেয়েকে বিয়ে করার অনুরোধ করেন৷ অসুস্থ বাবার
অনুরোধ রাখতে তিনি বিয়ের জন্য রাজি হন৷ বিয়ে ঠিক
হয় পার্টির সক্রিয় কর্মী কমরেড রোহিনী দাসের সাথে৷
তিনি ছিলেন সিলেট জেলা কৃষক আন্দোলনের অন্যতম
প্রতিষ্ঠাতা নেতা৷ রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে
থাকায় বর ও কনেকে গোপনে কলকাতায় চলে যেতে হয়
এবং ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন ঘরোয়াভাবে রেজিস্ট্রেশনের
মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়৷ বিয়ের পর পার্টির
নির্দেশে হেনা দাস ও রোহিনী দাস অনেকদিন আত্মগোপন
করে ছিলেন৷ ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি রোহিনী দাস
পরলোকগমন করেন৷
তাঁর দুই মেয়ে৷ বড় মেয়ে দীপা ইসলাম (বুলু) স্বনামধন্য
গাইনোকোলোজিস্ট এবং ছোট মেয়ে চম্পা জামান
কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি অর্জন করেছেন৷
কর্মজীবন: ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকার 'গেণ্ডারিয়া
মনিজা রহমান বালিকা বিদ্যালয়ে' শিক্ষকতার চাকরি
নেন৷ সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ১১৫ টাকা৷ কিন্তু
স্বামী রোহিনী দাস তখনো আত্মগোপনে৷ ছুটি পেলে বছরে
দু'একবার হেনা দাস বুলুকে নিয়ে সিলেটে যেয়ে স্বামীর
সাথে দেখা করতেন৷ বিয়ের ১৩ বছরের মাথায় হেনা
দাস ১৯৬১ সালে 'নারায়ণগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে'
প্রধান শিক্ষিকা পদে যোগদান করেন৷ ওই স্কুল থেকে
তাঁর নামে একটি কোয়ার্টার বরাদ্দ করা হয়৷ এই
কোয়ার্টারেই তিনি নিজস্ব সংসার গোছানোর সুযোগ পান৷
এরপর 'মহাখালী ওয়ারলেস স্টেশন স্কুলে'-ও তিনি
কিছুদিন প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন৷ প্রায়
তিন যুগ শিক্ষকতার পর হেনা দাস ১৯৮৯ সালে শিক্ষকতা
পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন৷
মৃত্যু : তিনি ২০০৯ সালের ২০ জুলাই মারা যান।
মূল লেখক : এস এ এম হুসাইন
পুনর্লিখন : গুণীজন দল
|