| ১৯৫৫ সালের জুলাই মাস। রাজশাহী কারাগার থেকে
মুক্তির পর কামাল লোহানী ফিরে এলেন পাবনায়।
কিন্তু অভিভাবকদের সাথে তাঁর শুরু হলো রাজনীতি নিয়ে
মতবিরোধ। অভিভাবকরা চাইছিলেন লেখাপড়া শেষে
রাজনীতি করো, আপত্তি নেই। কিন্তু কামাল লোহানী তখন
রীতিমত রাজনীতি প্রভাবিত এবং মার্কসবাদের অনুসারী।
চোখে তাঁর বিপ্লবের ঐশ্বর্য। আর তাই তিনি ছোট চাচা
শিক্ষাবিদ তাসাদ্দুক লোহানীর কাছ থেকে মাত্র ১৫
টাকা চেয়ে নিয়ে অনিশ্চিতের পথে ঢাকা অভিমুখে পা
বাড়ালেন। জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন। আর
সেই সঙ্গে শুরু হল তাঁর নিজের পায়ে দাঁড়াবার সংগ্রাম।
ঢাকায় এসে তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর
সহযোগিতায় ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে দৈনিক 'মিল্লাত'
পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন। হাতেখড়ি
হল সাংবাদিকতায়। সেই থেকে তাঁর কলমের আঁচড়ে তৈরি
হতে লাগল এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
কামাল লোহানী নামেই সমধিক পরিচিত হলেও
পারিবারিক নাম তাঁর আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল
খান লোহানী। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান
লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী। তাঁদের বসতি ছিল
যমুনা পাড়ে। খাস কাউলিয়ায়। আগ্রাসী যমুনা-গর্ভে
তাঁদের বাড়িঘর জমি-জিরেত চলে যাওয়ার পর তাঁরা
সিরাজগঞ্জেরই উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে
বসতি স্থাপন করেন। আর এই সনতলা গ্রামেই ১৯৩৪
সালের ২৬ জুন কামাল লোহানী জন্মগ্রহণ করেন।
মাত্র ৬-৭ বছর বয়সে তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন।
একান্নবর্তী পরিবারে বাস হওয়ায় বাবা তাঁকে গ্রামে
না রেখে পাঠিয়ে দিলেন নিঃসন্তান ফুফুর কাছে
কলকাতায়। এখানে এসে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের এক বিভীষিকাময় দুর্যোগের মধ্যে।
কখনও ঘরে, কখনও-বা ট্রেঞ্চে। কিশোর কামাল লোহানী
শিশু বিদ্যাপীঠে গেছেন কানে তুলো দিয়ে। যদি সাইরেন
বাজে, ঘর থেকেই এ সতর্কতা। জাপানী বোমার
ভয়ে বালির দেয়াল তৈরি করা আছে স্কুল প্রাঙ্গণে,
সাইরেন বাজলেই ছুটে
যেতে হবে ঐখানে, ওটা ছিল স্কুলের নির্দেশ। কাটে
কাল, মানুষই সৃষ্টি করে দুর্ভিক্ষ। তিনি মন্বন্তর
দেখেছেন, দেখেছেন কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাবনা চলে এলেন। পাবনা
জেলা স্কুলে ভর্তি হলেন। থাকেন ছোট কাকা শিক্ষাবিদ
ও লেখক তাসাদ্দুক হোসেন খান লোহানীর কাছে। ১৯৫২
সাল, মাধ্যমিক পরীক্ষার বছর। ৫২'র ২১ ফেব্রুয়ারির
রক্ত ফিনকি দিয়ে যখন পাবনা পৌঁছালো, তখন বিশ্বযুদ্ধ,
মন্বন্তর আর দাঙ্গা দেখা তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এই কিশোর
ছুটে বেরিয়ে এলেন, কণ্ঠ উচ্চকিত করলেন মিছিলে,
হত্যার প্রতিবাদে। রাজনীতিতে সবক নিলেন তিনি ঐ
বায়ান্নর একুশ, বাইশ আর তেইশে ফেব্রুয়ারির রক্তধোয়া
দিনগুলোর সংঘাতে।
১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। এরপর
ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। এই কলেজ থেকেই
উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। আর উচ্চমাধ্যমিক পাস করার
পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন তিনি।
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যখন কলেজ
নির্বাচন এগিয়ে এলো তখন তাঁরা ক'জন সমমনা একজোট
হয়ে বাঁধলেন জোট, নাম দিলেন 'পাইওনিয়ার্স ফ্রন্ট'।
লড়লেন নির্বাচনে এবং
নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেন। এই ফ্রন্টের সদস্যরা
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর গড়ে ওঠা প্রগতিশীল
অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র
ইউনিয়ন করতেন। এছাড়া তাঁরা রাজনৈতিক সংগ্রাম
ছাড়াও সেইসময় সাংস্কৃতিক কাজে বেশ সক্রিয় ছিলেন।
সুতরাং কামাল লোহানীও এ থেকে বাইরে রইলেন না।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে
থাকলেন। উপস্থাপনা, গ্রন্থনা এবং আবৃত্তিতে পাঠ
নিলেন তিনি।
১৯৫৩ সালে পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ্ পার্কে (বর্তমান
স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগ কাউন্সিল অনুষ্ঠানের আয়োজন
করা হয়। এইখানে যোগদানের জন্য আসেন তৎকালীন
পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খুনী নুরুল আমিন, পাকিস্তানের
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সর্দার আব্দুর রব নিশতার, কেন্দ্রীয়
মুসলিম লীগ নেতা খান আব্দুল কাউয়ুম খান, প্রাদেশিক
লীগ নেতা মোহাম্মদ আফজাল প্রমুখ। ছাত্র হত্যাকারী
নূরুল আমিনের পাবনা আগমন ও মুসলিম লীগ সম্মেলনের
প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করায় কামাল লোহানী
পাবনার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং এডওয়ার্ড কলেজের
অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের সাথে প্রথম গ্রেফতার হলেন।
১৯৫৪ সালের মার্চে পূর্ববাংলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক
নির্বাচন। কামাল লোহানী তথা সকল প্রগতিশীল
ছাত্ররাই যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে
অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাবনা
টাউন হলে মহান শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে গণজমায়েত এবং
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিপুল জনতার স্বতঃর্স্ফুত অংশগ্রহণে লীগ সরকার তটস্থ
হয়ে পরদিন গ্রেফতার শুরু করে। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে
কামাল লোহানী গ্রেফতার হন। এবং যুক্তফ্রন্টের বিপুল
বিজয়ে নির্বাচনের পর মুক্তিলাভ করেন। কিন্তু মার্কিনী
মদদপুষ্ট পাকিস্তান সরকার এই বিজয়কে গ্রহণ করেনি।
এবং শঙ্কিত হয়ে ১৯৫৪ সালের ২৯ মে ৯২-(ক) ধারার
মাধ্যমে পূর্ববাংলায় 'গভর্নরী শাসন' চালু করে। মেজর
জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা পূর্ববাংলায় গভর্নর হয়ে
আসে এবং ব্যাপক ধরপাকড়ের নির্দেশ দেন।
কলেজ ছুটি থাকায় কামাল লোহানী গ্রামের বাড়ি চলে
যান। এসময় খান সনতলা গ্রাম থেকে ১লা জুন পুনরায়
গ্রেফতার হন তিনি এবং উল্লাপাড়া থানা হাজতে দিনভর
থাকার পর রাতে তাঁকে পুলিশ পাহারায় পাবনা
ডিস্ট্রিক্ট জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঈদের দিন পাবনা
জেলে 'রাজবন্দি' হিসেবে কারাজীবন শুরু করেন কিন্তু
কিছুদিন পর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়
এবং ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে রাজশাহী কারাগার থেকে
মুক্তি লাভ করেন তিনি।
১৯৫৫ সালে তিনি ন্যাপ-এ যোগ দেন এবং জাতীয়
রাজনীতিতে সক্রিয় হন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে সামরিক
অভ্যুত্থানে দেশ বিপন্ন হলে, কামাল লোহানী আত্মগোপন
করতে বাধ্য হলেন। কিছুদিন পর গ্রেফতারীর ঘোর কেটে
গেলে তিনি নৃত্যগুরু জি.এ. মান্নানের এক সাক্ষাৎকার
গ্রহণ করেন এবং দৈনিক পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন।
এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নৃত্য অধ্যায়। এসময়
বুলবুল একাডেমীতে জি. এ. মান্নান যখন 'নক্সী কাঁথার
মাঠ' প্রযোজনা করলেন, তখন ছেলে চরিত্রে অংশ নিলেন
কামাল লোহানী। ১৯৫৯ সালে এই নৃত্যনাট্য নিয়ে পশ্চিম
পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ সফর করেন তিনি। ১৯৬১
সালে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য
হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে যান এবং ইরান, ইরাক সফর
করেন।
১৯৬০ সালে বিয়ে করলেন তাঁরই চাচাতো বোন দীপ্তি
লোহানীকে। দীপ্তি তখন সমাজল্যাণে মাষ্টার্স
করছিলেন। জীবিকার চাপ শুরু হল। কামাল লোহানী
বনেদী সংবাদপত্র দৈনিক 'আজাদ'-এ যোগ দিলেন।
কামাল লোহানী ও দীপ্তি লোহানী দম্পতির এক ছেলে ও
দুই মেয়ে। তাঁরা হলেন-সাগর লোহানী, বন্যা লোহানী ,
ঊর্মি লোহানী।
১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গর্জে
উঠলো। কামাল লোহানীর নামে জারি হল হুলিয়া।
ইতিমধ্যেই তাঁদের প্রথম পুত্র সাগরের জন্ম হল ১৯৬২
সালের ৩০ জানুয়ারি। আর ঐদিনই গ্রেফতার হলেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী। পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হল। ১৩
ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে দৈনিক 'আজাদ' থেকে ঘরে
ফেরার পথে গ্রেফতার হলেন তিনি। এই সময় ঢাকা
সেন্ট্রাল জেলের ২৬ নম্বর সেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ, আবুল মনসুর আহমেদ, হায়দার
আকবর খান রনো, অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই
একসাথে ছিলেন। সাড়ে তিন মাস পরে তিনি মুক্তি লাভ
করেন।
১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক 'সংবাদ'-এ
সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দিয়ে অল্প দিনেই
শিফট-ইন-চার্জ পদে উন্নীত হন। এরপর তিনি পাকিস্তান
ফিচার সিন্ডিকেটে যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে সিন্ডিকেট
প্রায় বন্ধের উপক্রম হলে কামাল লোহানী অবজারভার
গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের দৈনিক 'পূর্বদেশ' পত্রিকায়
শিফট ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেন। পরে চীফ সাব-এডিটর
পদে উন্নীত হন। এই সময় তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে
দু'দফায় যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী
'ছায়ানট' সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক
হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাড়ে চার বছর এই
দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭
সালে গড়ে তোলেন 'ক্রান্তি'। ১৯৬৭ সালের ২২ ও ২৩
ফেব্রুয়ারি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্বোধন হয়
ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে। আয়োজন করেন গণসংগীতের
অনুষ্ঠান 'ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে'। নাটক 'আলোর
পথযাত্রী' পরিচালনা ও এতে অভিনয় করেন এবং
নৃত্যনাট্য 'জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে' বিবেকের
ভূমিকায় নেচেছিলেন কামাল লোহানী।
১৯৭০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের
সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ
ক্র্যাকডাউনের পর যতদিন তিনি পূর্ববাংলায় ছিলেন,
ততদিন সামরিক শাসকচক্রের নানা দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে
তৎপর ছিলেন। এইসময়ে তিনি প্রখ্যাত সংবাদিক ফয়েজ
আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক 'স্বরাজ' পত্রিকায় কয়েকটি
অগ্নিগর্ভ প্রতিবেদন রচনা করেন। অবশেষে এপ্রিলের
শেষে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠনগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের
পক্ষে সংঘবদ্ধ করে 'বিক্ষুদ্ধ শিল্পী গোষ্ঠী' গঠনে
তৎপর ছিলেন। কিন্তু অবস্থার অবনতিতে অবশেষে
কুমিল্লার চান্দিনা হয়ে নৌকাযোগে ভারত সীমান্তে
পৌঁছেন এবং ঐ স্থানের থানা হাজতে নিরাপদে রাত
কাটানোর পরেরদিন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা
গিয়ে উপস্থিত হন।
আগরতলা থেকে কামাল লোহানী অন্যদের সাথে ট্রেনযোগে
কলকাতা যান। যাত্রাসঙ্গী প্রখ্যাত ফুটবলার প্রতাপ
শঙ্কর হাজরাদের আত্নীয়র আমহার্ষ্ট
ষ্ট্রীটের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। কিন্তু সেখানে
থেকেই কামাল লোহনী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে
অংশগ্রহণের সূত্র খুঁজতে থাকেন। এমন সময় তাঁর
সাংবাদিক বন্ধু মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী তাঁকে
'জয়বাংলা' পত্রিকায় নিয়ে যান। ঐখানে কাজ করতে
করতে তাঁর সাথে আমিনুল হক বাদশার দেখা হয়।
আমিনুল হক বাদশা অনেকটা 'হাইজ্যাক' করার মতো
তাঁকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে নিয়ে যান বালীগঞ্জ সার্কুলার
রোডে। সেখানে তখন আয়োজন চলছিল 'স্বাধীন বাংলা
বেতার কেন্দ্র'-এর ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ
ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের। বালীগঞ্জের এই বাড়িটিতে
মন্ত্রীরা (অর্থাৎ প্রবাসী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের
মন্ত্রীরা) বাস করতেন। তাঁরা বেতারের জন্য বাড়িটি
ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। এইখানেই প্রচলিত রীতির
যন্ত্রপাতি ও স্টুডিও ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এই
শক্তিধর ট্রান্সমিশনটি উদ্বোধন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে
কামাল লোহানী কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতাটি
আবৃত্তি করেন।
আশফাকুর রহমান খান, টি এইচ শিকদার, তাহের সুলতান
কেউই প্রকৌশলী ছিলেন না, তবু কোন ভারতীয়র সাহায্য
না নিয়েই চালু হয়েছিল এই কেন্দ্রটি। চট্টগ্রামে যারা
'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন, তখনও তাঁরা কেউ পৌঁছাননি। সৈয়দ হাসান
ইমাম 'সালেহ আহমদ' নামে সংবাদ পাঠ শুরু করেন।
সাংবাদিক কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের
সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব নিলেন। কিন্তু বিপ্লবী
বেতারে কি আর বসে থাকা যায়। যখন যে দায়িত্ব দেয়া
হবে, তখন সেটা পালন করতেই হবে। তিনিও সংবাদ
বিভাগ সংগঠন করা ছাড়াও সংবাদ পাঠ, কথিকা লেখা ও
প্রচার, ঘোষণা, শ্লোগান দেয়া ইত্যাদিতে কণ্ঠ
দিয়েছেন। বিদ্রোহী বেতারে সবাই কর্মী এবং প্রয়োজনে
সকলকে সবকিছুই করতে হয়।
১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকার ঢাকা চলে
আসবে। এজন্য কামাল লোহানী চলে এলেন ঢাকায়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ঢাকা আগমনের
ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী।
১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দায়িত্ব নিলেন ঢাকা
বেতারের। দায়িত্ব নেয়ার পর বিধ্বস্ত বেতারকে
পুনর্গঠনে ব্রতী হন তিনি। দেশ স্বাধীন হলেও প্রশাসনে
পরিবর্তন আসেনি বলে অনেকটা নিরব প্রতিবাদেই
বেতারের ট্রান্সক্রিপশন পরিচালক হিসেবে তিনি বেতার
ত্যাগ করেন। ১৯৭৩ সালে ২০ জানুয়ারি পুনরায়
সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। যোগ দেন 'দৈনিক জনপদ'
নামে একটি নতুন পত্রিকায়। তিনি ঢাকা সাংবাদিক
ইউনিয়নের সভাপতি হন।
১৯৭৪ সালে 'জনপদ' ছেড়ে 'বঙ্গবার্তা' প্রকাশ করেন।
মওলানা ভাসানী সমর্থিত এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন
প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ। প্রায় তিনমাস পর
পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে কামাল লোহানী
'দৈনিক বাংলার বাণী' পত্রিকার বার্তা সম্পাদক
নিযুক্ত হন। এ বছরই তাঁর নেতৃত্বে পুনরায় ঢাকা
সাংবাদিক ইউনিয়ন নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে
কামাল লোহানী সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচন
উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিক আবেদ খান রচিত
'জ্বালামুখ' নাটক পরিচালনা ও নিপীড়নে বিধ্বস্ত এক
মানুষের চরিত্রে অভিনয়ও করেন। এবং এবছরই
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সাক্ষরের জন্য পূর্ব জার্মানি,
হাঙ্গেরী ও চেকোশ্লোভাকিয়া সফর করেন।
বাকশাল সরকার ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র
এ্যানালমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে মাত্র চারটি পত্রিকা
ছাড়া সব পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। নির্মল সেন
ও কামাল লোহানী বাকশালে যোগদানেও অস্বীকৃতি
জানান। এ সময় চাকুরিহারা কামাল লোহানী খুবই
অর্থকষ্টে পড়েন।
১৯৭৭ সালে ৬ জানুয়ারি সরকার রাজশাহী থেকে
প্রকাশিত 'দৈনিক বার্তা'র নির্বাহী সম্পাদক নিযুক্ত
করে ঢাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন তাঁকে। ১৯৭৮ সালে
তাঁকে সম্পাদক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। সম্পাদক হবার পর
জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকা-তে অনুষ্ঠিতব্য কমনওয়েলথ
রাষ্ট্রপ্রধান সম্মেলনে বাংলাদেশের একজন সম্পাদক
হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল এনট্যুরেজের সদস্য মনোনীত
হন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের প্রস্তাবানুযায়ী
চিরন্তন পরিধেয় পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহার করে স্যুট
কোট পরতে অস্বীকার করেন। ফলে সামরিক সচিবের সাথে
বিতর্ক হয় এবং বিদেশ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হলে
'দৈনিক বার্তা' ছেড়ে 'বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট'
এর 'ডেপথনিউজ বাংলাদেশ'-এর সম্পাদক হিসেবে
দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক'মাস পরেই তিনি পিআইবি'র
এসোসিয়েট এডিটর পদে নিযুক্ত হন।
১৯৮৩ সালে কামাল লোহানী আবার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে
সরাসরি জড়িত হয়ে বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা গঠন
করেন এবং গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি হন। তিনি উদীচী
শিল্পী গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি
ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও উপদেষ্টা ।
১৯৯১ সালে তিনি শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক
হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ষোল মাসের মাথায়
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি
পিআইবিতে ফিরে আসেন। কিন্তু পিআইবি'র
মহাপরিচালক তাঁকে জোরপূর্বক অবসরে পাঠান। এই সময়
রাজনৈতিক অভিযাত্রার পাশাপাশি যুক্ত হল সংস্কৃতি
সংগ্রাম। কামাল লোহানী ২০০৮ সালের জাতীয়
নির্বাচনে মহাজোটের বিজয়ের পর দুই বছরের জন্য আবার
শিল্পকলা
একাডেমীর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
সবকিছুর পাশাপাশি কামাল লোহানী 'আমার বাংলা'
নামে শিল্প-সংস্কৃতি গবেষণা ও অনুশীলন চক্র গঠন
করেছেন। তাঁর লেখা 'আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম',
'আমরা হারবো না' এবং 'লড়াইয়ের গান' নামক গ্রন্থ
প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রাজনৈতিক
বিষয় নিয়ে প্রকাশিত তাঁর লেখা নিয়ে বই আকারে
বেরিয়েছে - 'সত্যি কথা বলতে কি"। এবং কবিতার বই
'দ্রোহে ও প্রেমে' প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালে।
এছাড়া তিনি বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং
স্বাধীন বাংলা বেতার বিষয়ে দুটি গ্রন্থ রচনার
পরিকল্পনা করেছেন।
'ক্রান্তি' শিল্পী গোষ্ঠী কামাল লোহানীকে 'ক্রান্তি
স্মারক- ২০০৩' প্রদান করে। ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী বহু
আগে ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক প্রদান করেছে। এ ছাড়াও
বহু সম্মাননা তাঁর মিলেছে। কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ
সম্মাননা পেয়েছেন তিনি ১৯৯১ সালে। জাহানারা ইমাম
পদক পেয়েছেন ২০০৮ সালে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী:
জন্ম: সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা
গ্রামে ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন কামাল লোহানী
জন্মগ্রহণ করেন। কামাল লোহানী নামেই সমধিক পরিচিত
হলেও পারিবারিক নাম তাঁর আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা
কামাল খান লোহানী।
বাবা-মা: বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী।
মা রোকেয়া খান লোহানী।
পড়াশুনা: কামাল লোহানী প্রথমে কলকাতার শিশু
বিদ্যাপীঠে পড়াশুনা শুরু করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮
সালে পাবনা চলে এলেন। ভর্তি হলেন পাবনা জিলা
স্কুলে। ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
এরপর ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। এই কলেজ
থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। আর উচ্চমাধ্যমিক পাস
করার পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন তিনি।
কর্মজীবন: কামাল লোহানী 'দৈনিক আজাদ', 'দৈনিক
সংবাদ', 'দৈনিক পূর্বদেশ', 'দৈনিক বার্তা'সহ
বিভিন্ন পত্রিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত
ছিলেন। তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে দু'দফায় যুগ্ম-সম্পাদক
এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হন। তিনি
গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি হন। তিনি উদীচী শিল্পী
গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও উপদেষ্টা। ১৯৬২ সালে
স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী 'ছায়ানট'
সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব
গ্রহণ করেন। সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন
'ক্রান্তি'। দুই দফায় তিনি শিল্পকলা একাডেমীর
মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংসার জীবন: ১৯৬০ সালে বিয়ে করেছিলেন তাঁরই চাচাতো
বোন দীপ্তি লোহানীকে। কামাল লোহানী ও দীপ্তি
লোহানী দম্পতির
এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তাঁরা হলেন-সাগর লোহানী, বন্যা
লোহানী, ঊর্মি লোহানী।
তথ্যসূত্র- 'কামাল লোহানী -সময়ের সাহস',
সম্পাদনা-আবুল বারক্ আলভী, সাগর লোহানী, বন্যা
লোহানী, অনন্য রায়হান, মাহমুদুল হাসান,
প্রকাশক-সূচীপত্র, প্রথম প্রকাশ-জুন ২০০৪ইং।
লেখক: আশরাফি ফেরদৌসী |