| একজন কয়েদি তিনি৷ কারাগারের নিউ জেল বিল্ডিং
ভবনে বন্দি৷ সেই শৃঙ্খলিত চত্বরে
পচা নর্দমা ভরাট করে বানানোর ইচ্ছা ফুলের বাগান,
তাই ফুল গাছ লাগানোয় ব্যস্ত৷
নিজ হাতে মাটি ভাগ করে, আপন তত্ত্বাবধানে রোপন
করে চলেছেন শত ফুলের চারাগাছ৷
পরিচর্যার জন্য গোবর সার আনিয়েছেন বাড়ি থেকে৷ তাঁর
হাতের মমতামাখা স্পর্শে
চারাগুলো যেন স্নাত হয় সঞ্জীবনী ধারায়৷ তাঁর
অনুপস্থিতিতেও বেড়ে উঠবে, বিকশিত
হবে, ফুল ফুটবে সেগুলোয়৷ তাঁর স্পর্শধন্য চারাগুলো এ
প্রতিজ্ঞাই শোনায় কানে কানে আর
তা বিশ্বাস করেই যেন তন্ময় হয়ে, নিজের আশা
আকাঙ্ক্ষার চারাই রোপন করে চলেছেন
তিনি৷
রাত৷ এবার কারাগারের কক্ষে তিনি৷ বাইরে নিথর
থকথকে অন্ধকার৷ হঠাত্ খুলে যায়
কারাগারের মূল ফটক৷ চত্বরে প্রবেশ করে কালো
পোশাকধারীর নেতৃত্বে অস্ত্রধারী ৪ জন
সৈন্য৷
বেজে ওঠে পাগলা ঘন্টা৷
বেজে ওঠে ডিআইজি প্রিজনের টেলিফোন৷
টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে এক দাম্ভিক
দানবীয় কন্ঠস্বর৷
- 'Let them do
whatever
they want.'
ডিআইজির হাত ঘুরে জেলারের হাতে ধরিয়ে দেয়া
তালিকা অনুযায়ী একই ঘরে সমবেত
করা হয় তিন সহযাত্রীসহ তাঁকে৷ এবার পরিচয়ের
পালা৷
ইনি...
থমকে যায় বক্তা৷
পরিচিতির প্রথম শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে গর্জে ওঠে
ঘাতকের হাতের স্বয়ংক্রিয়
অস্ত্র৷ ৬০ রাউন্ড গুলির পর সব কিছু স্তব্ধ৷
সুনশান৷
নীরব৷
মৃত্যুই শুধু যেন নীরবতাকে ধারণ করার স্পর্ধা রাখে৷
তিন সহযাত্রী নেতাসহ খুন হন, স্বাধীন বাংলাদেশের
ধাত্রী৷
তাজউদ্দীন আহমদ৷
শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের, গজারি বনের ছায়া ঢাকা,
গ্রাম বাংলার অন্যান্য গ্রামের
মতোই, ঢাকার অদূরে কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রাম৷
মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের মৌলবি
ইয়াসিন খান আর মেহেরুন্নেসা খানম দম্পতির এক পুত্র
সন্তানের জন্ম হয় ১৯২৫ সালের
২৩ জুলাই তারিখে৷ পুত্রের নাম রাখা হয়, তাজউদ্দীন
আহমদ৷
৪ ভাই, ৬ বোনের মাঝে ৪র্থ তাজউদ্দীন আহমদের
পড়াশোনা শুরু বাবার কাছে আরবি
শিক্ষার মাধ্যমে, একই সময়ে ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হন
বাড়ির দুই কিলোমিটার দূরের
ভূলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ ১ম ও ২য় শ্রেণীতে ১ম
স্থান অর্জন করেন৷ ৪র্থ
শ্রেণীতে ভর্তি হন বাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার
দূরের কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ
স্কুলে৷ মা'র প্রচেষ্টা ছিল ছেলেকে ইংরেজি মাধ্যম
স্কুলে লেখাপড়া করানোর৷ সফল হন
তিনি৷ এরপর বিদ্যালয় পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায়
পড়েছেন কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস
ইনস্টিটিউশন, ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাই স্কুল ও সেন্ট
গ্রেগরিজ হাই স্কুলে৷ এসময়
একজন স্কাউট হিসেবে স্কাউট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন৷
পরবর্তী কর্মজীবনে যা তাঁর
প্রেরণা ও কাজ করার ক্ষমতা জুগিয়েছে৷ এসম্পর্কে তিনি
বলেছেন - 'স্কাউট হিসেবে
শিক্ষা, স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাকে অমানুষিক পরিশ্রম
করতে প্রেরণা ও ক্ষমতা
জুগিয়েছে৷' এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সিভিল
ডিফেন্স-এর ট্রেনিং নিয়েছিলেন
তিনি৷
এম.ই স্কলারশিপ পরীক্ষায় ঢাকা জেলায় প্রথম স্থান
লাভ করেন৷ শুধু তাই নয় প্রতিভার
স্বাক্ষর রাখেন মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায়৷ ১৯৪৪ সালে এই
পরীক্ষায় অবিভক্ত বাংলায়
দ্বাদশ স্থান লাভ করেন তিনি ৷ এ সময়ই জড়িয়ে পড়েন
মুসলিম লীগের রাজনীতির
সাথে৷ হয়ে ওঠেন পার্টির সক্রিয় সদস্য৷ এবছর
নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের
কাউন্সিলর নির্বাচিত হন৷ যদিও মুসলিম লীগের
গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির প্রতিবাদে,
পরবর্তীতে দলের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন৷ একই
বছর কলকতায় শেখ মুজিবুর
রহামনের সাথে পরিচয় হয় তাঁর৷ ভালো পড়াশোনার
ধারাবাহিকতা বজায় ছিল উচ্চ
মাধ্যমিকেও৷ ঢাকা বোর্ডে অর্জন করেন ৪র্থ স্থান এবং
ভর্তি হন ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ উচ্চ শিক্ষায় তাঁর বিষয় ছিল
অর্থনীতি৷ এমনই মেধা-উজ্জ্বল শিক্ষা
জীবনের ধারক ছিলেন এ অনন্য ব্যক্তিত্ব৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে ছিল
এদেশীয় রাজনীতির প্রতিফলন৷ এ
পরিবেশ তাজউদ্দীন আহমদকে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে
ভাবতে প্ররোচিত করে৷ জড়িয়ে যান
সক্রিয় রাজনীতিতে৷ যদিও চিন্তা ধারায় দেশ ও
রাজনীতির বীজ রোপিত হয়েছিল অনেক
আগেই সেই কাপাসিয়াতে ৷ সেইসময় এই কাপাসিয়াতেই
নির্বাসিত হয়েছিলেন ব্রিটিশ
বিরোধী আন্দোলনের তিন বিপ্লবী রাজেন্দ্র নারায়ণ
চক্রবর্তী, বিরেশ্বর বন্দ্যাপাধ্যায়
ও মনীন্দ্র শ্রীমানী৷ তিনি তখন কাপাসিয়া মাইনর
স্কুলের ছাত্র ৷ তাজউদ্দীনের প্রখর
মেধার পরিচয় পান এই বিপ্লবীরা এবং তাঁকে ভূগোল,
অর্থনীতি, রাজনীতি ও মনীষীদের
জীবনী সম্পর্কে জানতে সাহায্য করেন তাঁরা ৷ তাঁদের
কাছ থেকে নিয়ে পড়ে ফেলেন
প্রায় ৫০/৬০ খানা বই৷ বিপ্লবীরা তাঁর চেতনার মাঝে
রোপন করেদেন শোষণ ও
বঞ্চনাহীন সমাজ আর অধিকার আদায়ের রাজনীতির বীজ৷
এক সময় বিপ্লবীরা চলে যান৷
যাবার সময় দেখা হয়নি কিন্তু তাঁর বিছানায় রেখে
যাওয়া গোলাপের তোড়ায় মাখা ছিল
আগামী দিনের রাজনৈতিক শুভকামনার সুবাস৷ তাজউদ্দীন
আহমদ সেই সুবাসকে ঠিকই ধারণ
করেছিলেন নিশ্বাসে৷ আর তাই তো ১৯৪৮ এ প্রতিষ্ঠিত
পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগের অন্যতম
প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন তিনি৷ ছিলেন আওয়ামী মুসলিম
লীগ গঠনের উদ্যোক্তাদের
একজন৷
শুধুমাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা আর আবাস ভূমির জন্যই নয়,
বাঙালিকে আন্দোলন করে রক্ত
ঝরাতে হয়েছে মুখের ভাষার দাবিতেও৷ ভাষা আন্দোলনেও
তাজউদ্দীন ছিলেন সোচ্চার
কন্ঠ৷ ১৯৪৮-এর ১১ এবং ১৩ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম
পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে
ধর্মঘট-কর্মসূচি ও বৈঠক করেন৷ ২৪ মার্চ মোহাম্মদ আলী
জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা
সংগ্রাম পরিষদের নেতারাসহ তিনি বৈঠক করেন৷ যদিও
জিন্নাহর অসহিষ্ণু আচরণের
কারণে এ বৈঠক কোনো সুফল বয়ে আনেনি৷
১৯৫৩ সাল৷ 'আওয়ামী মুসলীম লীগ' দলের কাউন্সিলে
আনুষ্ঠানিকভাবে 'মুসলিম' শব্দটি
দলের নাম থেকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেয়৷ শেখ
মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ
সম্পাদক নির্বাচিত হন৷ এ সময়ই আওয়ামী লীগে
সক্রিয়ভাবে যোগ দেন তাজউদ্দীন
আহমদ৷ এ বছরই তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের
সাধারণ সম্পাদক হন৷ রাজনৈতিক
কর্মকান্ডের কারণে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর মাঝে
সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে
ওঠে৷ দেশীয় রাজনীতিতে বাড়তে থাকে আওয়ামী লীগের
প্রভাব৷
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর-পূর্ব আসনে
যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হন তাজউদ্দীন৷
প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ
সম্পাদক প্রবীণ নেতা ফকির
আব্দুল মান্নানকে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে
দেন৷ তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯
বছর৷ এ নির্বাচনি প্রচারণায় হাতির পিঠে চড়ে তাঁর
জন্য ভোট সংগ্রহ করেছেন
জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী৷
১৯৫৯ সালের ২৬ এপ্রিল সৈয়দা জোহরা খাতুন লিলির
সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন
তিনি৷ বিয়ের অলংকার ছিল বেলী ফুলের মালা৷ তাঁর
স্নিগ্ধ চেতনা আর মানসিকতার
সুগন্ধই বহন করছিল মালার শুভ্র বেলী ফুলগুলো৷
ষাটের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে
পুনরুজ্জীবিত করার এক সাহসী পদক্ষেপ
নিয়ে সে অনুযায়ী কর্মকান্ড এগিয়ে নিতে সক্ষম
হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান৷ এসময়
জেনারেল আইয়ুবের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে
(১৯৫৮-১৯৬৯) আওয়ামী লীগ স্বায়ত্বশাসন
আন্দোলনে অগ্রপথিক হিসেবে ভূমিকা পালন করে এবং শেখ
মুজিবুর রহমান দলের
অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন৷ এ রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন
ও অগ্রগামিতার আন্দোলনে,
রাজনৈতিক বলিষ্ঠ পদক্ষেপের জন্য তাজউদ্দীন আহমদ
ক্রমে হয়ে উঠতে থাকেন ভবিষ্যতের
দৃপ্ত সারথী৷
চলতে থাকে রাজনীতি৷ গ্রেফতার হন ১৯৬২ সালে৷ ১৯৬৪
সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হন
আওয়ামী লীগের৷ ৬ দফার ঐতিহাসিক ১৯৬৬ সালে হন
সাধারণ সম্পাদক৷ ৬ দফা
আন্দোলনের কারণে দেশরক্ষা আইনে ১৯৬৬ সালের ৮ মে
পুনরায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ
করেন তাজউদ্দীন ৷ মুক্ত হন ১৯৬৯-এর ১২ ফেব্রুয়ারি৷
ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে শেখ
মুজিবের আলোচনায় তিনি ছিলেন ফাইলপত্র নিয়ে নিয়মিত
হাজির হওয়া গুরুত্বপূর্ণ
সহযোগী, যিনি তাঁর দাবির ব্যাপারে ছিলেন অনড়৷
ইয়াহিয়া তাজউদ্দীনকে ভয় করতেন৷
কারণ আলোচনার টেবিলে তিনি ছিলেন খুবই কঠোর, কোনো
ছিটেফোঁটা আবেগও তাঁর মাঝে
কাজ করত না৷
সব আলোচনা-আন্দোলন যখন অনিবার্যভাবে একটি সংঘাতময়
যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে
যাচ্ছে, তার আগেই শেখ মুজিব দলীয় হাই কমান্ড গঠন
করেন৷ ৫ জনের হাই কমান্ডের
একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তিনি৷
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত৷ বাঙালি জাতির উপর নেমে
আসে পাকিস্তানি বাহিনীর
নারকীয়, বীভত্স, খড়গ হস্ত৷ এ বাহিনী নিরীহ
বাংলাদেশিদের নিধনযজ্ঞে মেতে
ওঠে৷ গ্রেফতার হন শেখ মুজিব৷ তাজউদ্দীন তাঁর
সহযাত্রী ব্যারিস্টার
আমীর-উল-ইসলামকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন৷
মহম্মদ আলী ছদ্মনাম নিয়ে,
গ্রেফতার এড়িয়ে, শত্রু সেনার চোখ এড়িয়ে তিনি
অবশেষে হাজির হন ভারতীয়
সীমান্তে৷
দীর্ঘ পথ শ্রমে ক্লান্ত৷ সীমান্ত থেকে সামান্য দূরে
বৃটিশ আমলে তৈরি কালভার্টের
উপর শরীর এলিয়ে দেন৷ তাঁর অবসন্ন চোখের পাতায়
নেমে আসতে চায় রাজ্যের ঘুম৷
না, তিনি ঘুমিয়ে পড়েননি৷ তিনি ঘুমিয়ে গেলে তো
চলবেনা৷ দেশ স্বাধীন করতে,
স্বাধীন দেশকে ভূমিষ্ঠ করাতে তিনি তো নিজে ধাত্রী৷
তাঁর চোখে তো ঘুম শোভা
পায়না৷ তাঁর ভাষায়, 'আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি
বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত
নিয়েছিলাম তা হলো : একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা
করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা
সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা৷'
(তাজউদ্দীন আহমদ-ইতিহাসের পাতা থেকে। পৃষ্ঠা-২৯১)
যথাযোগ্য মর্যাদায়, স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে
ভারতে প্রবেশ করে তিনি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা
করেন৷ ভারত সহযোগিতার আশ্বাস
দেয়৷ জরুরি হয়ে পড়ে একটি সরকার গঠন৷ শেখ মুজিবুর
রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে, সৈয়দ
নজরুল ইসলামকে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী
রাষ্ট্রপতি আর নিজে প্রধানমন্ত্রী
হিসেবে ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেন ও ১৭ এপ্রিল
মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলার
আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করেন৷
শত বাধা বিপত্তির মাঝে তিনি প্রবাসী সরকার চালিয়ে
যেতে থাকেন৷ গঠন করেন
প্রশাসনিক কাঠামো, এমনকি আগামী পাঁচ বছরের
পরিকল্পনা৷ তিনি ছিলেন
প্রধানমন্ত্রী, একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী৷ তাই যুদ্ধের
সাংগঠনিক পরিকল্পনাও করতে হচ্ছিল তাঁকে৷ দেশ থেকে
চলে আসার সময় পরিবার
পরিজনের সাথে সাক্ষাত্ করতে না পেরে শুধু একটি
চিরকুট পাঠিয়েছিলেন স্ত্রীকে-
'সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও৷...'
প্রবাসে ও যতদিন দেশ স্বাধীন না
হবে ততদিন পারিবারিক জীবন-যাপন না করার সিদ্ধান্ত
নিয়ে ৮নং থিয়েটার রোডের
প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অফিস কক্ষের পেছনে
লাগোয়া একটি কক্ষে রাতে
থাকতেন৷ যুদ্ধকালীন ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের
বিভিন্ন এলাকা৷ মুক্তিবাহিনীকে,
সাধারণ মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন তিনি৷ শেখ মুজিবের
ছিল নেতৃত্বের ক্যারিশমা আর
তাজউদ্দীন আহমদের ছিল সাংগঠনিক দক্ষতা৷ মূলত তাঁর
সুনিপুণ দক্ষতার গুণেই যুদ্ধ সঠিক
পথে এগোতে থাকে৷ ড. আনিসুজ্জামানের ভাষায়-
'মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের পশ্চাতে তাঁর
কৌশলগত চিন্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার
ভূমিকা খুব বড় ছিল৷'
যুদ্ধের সময় দলের অভ্যন্তর থেকে বিভিন্ন সমস্যার
মুখোমুখি হয়েছেন৷ কিন্তু তিনি
দক্ষতার সাথে সেসব মোকাবেলাও করেছেন৷ এসময়
উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের ইস্যুকে
কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির বৈঠকে,
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন
আহমদের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা
হয়৷ যুদ্ধকালীন গঠিত সরকারের
মাঝেই ছিল বিভিন্ন বিরোধের ভূত৷ তিনি সবকিছুকে
বিবেচনা করতেন তাঁর নিরীক্ষার
দক্ষতা দিয়ে৷ বুকে ছিল তাঁর সত্যের সাহস আর মনে ছিল
নেতার প্রতি অবিচল আস্থা৷
দূরদর্শিতা ছিল তাঁর অসামান্য৷ পকিস্তানিরা একটি
সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনী৷ তাদের
সাথে লড়াই করার জন্য দরকার মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ,
অস্ত্র, গোলা-বারুদ৷ এসব কিছুর
ব্যবস্থা করাও সহজ ছিল না৷ কিন্তু তিনি সবকিছু
মোকাবিলা করেছেন দক্ষতার সাথে৷
বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সমন্বয় সাধন
এবং নতুন জন্ম নেয়া
বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কূটনৈতিক
তত্পরতাও চালিয়ে যান
তাজউদ্দীন৷ এমনিভাবে যুদ্ধের সময়ে কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে,
কখনও শরণার্থী শিবিরে,
কখনো ভারতীয় মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করে আবার কখনও
স্বাধীন বাংলা বেতার
কেন্দ্রের সংগ্রামী শিল্পীদের সাথে নিয়ে তাঁর যুদ্ধের
প্রতিটি দিন কাটতে থাকে৷
রক্ত ঝরতে থাকে৷
কান্না ঝরতে থাকে৷
সে কান্নায় লেখা হতে থাকে আগামীর ইতিহাস৷
তিনি বুঝেছিলেন এ যুদ্ধের পরিণতি আসন্ন শীতকালের
ভেতরই হয়ে যাবে৷ তাঁর
তত্পরতায় সঠিকভাবেই এগোতে থাকে সবকিছু৷ ভারত
স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে৷ দিনটি
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১৷ ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতীয় মিত্র
বাহিনী যৌথভাবে বাঙালি
মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশ নেয়৷ প্রচন্ড আক্রমণে
পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে পাক হানাদার
বাহিনী৷ যুদ্ধ চলাকালীন মুজিব নগর সরকারের কতিপয়
ষড়যন্ত্রী নেতা পাকিস্তানের
সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু তা কঠোর হস্তে
দমন করা হয়৷
পাকিস্তানিদের রসদ সরবরাহে বাধা হয়ে দাঁড়ায়
মুক্তিযোদ্ধারা৷ তাদের পক্ষে
মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ প্রতিহত করা ছিল দুস্কর৷
অবশেষে পাকিস্তানিরা পরাজয়
স্বীকার করতে বাধ্য হয়৷
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের
বিজয় পাখির৷ ১৯৭২ সালের ৪
জানুয়ারি তাজউদ্দীন এক টিভি ভাষণে বলেন- '৩০
লক্ষাধিক মানুষের আত্মাহুতির মাঝ
দিয়ে আমরা হানাদার পশুশক্তির হাত থেকে
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত বাংলাদেশকে
স্বাধীন করে ঢাকার বুকে সোনালি রক্তিম বলয় খচিত
পতাকা উত্তোলন করেছি৷'
তিনি জানতেন তিনি একজন ধাত্রী৷ আর অভ্যূদিত
বাংলাদেশের জনক রয়েছেন শত্রু
শিবিরে বন্দি৷ তিনি কাঁদেন দুঃখে, ক্ষোভে, বেদনায়৷
মুক্তি দাবি করেন জাতির
জনকের৷
এবার সম্মিলিতভাবে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন৷ শেখ
মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলে
মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়৷
তাজউদ্দীন আহমদ হন নয়া
সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী৷ ১৯৭৩-এ ঢাকা-২২
আসন থেকে সংসদ সদস্য
নির্বাচিত হন৷ এতদিন যিনি সংগ্রাম করেছেন দেশ
স্বাধীনের জন্য এখন তিনি
সংগ্রামে নামেন দেশ গঠনের৷ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন
ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির
ব্যবস্থাকে চাঙা করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান
তিনি৷ কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি
ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চাঙা করে তুলতে বেগ পেতে
হয় তাঁকে৷
নতুন দেশে নেতা কর্মীদের সাথে দলের, আর জনগণের
সাথে সরকারের দূরত্ব বাড়তে
থাকে৷ ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক
কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশনের
বক্তৃতায় তিনি দল, সরকার এবং নেতা ও কর্মীদের মাঝে
দূরত্ব দূর করে, সংগঠন এবং
সরকারের মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভবিষ্যত্
নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান৷
এদিকে সুবিধাভোগী, দূর্নীতিপরায়ণ, চাটুকার রাজনীতি
সংশ্লিষ্টদের নির্লজ্জ তত্পরতা
বেড়েই চলে৷ শেখ মুজিবের সাথে তাজউদ্দীন আহমদের
দূরত্ব বাড়তে থাকে৷ তাঁদের মাঝে
নীতিগত বিরোধ দেখা দেয়৷ তাঁদের সুন্দর সম্পর্কে ফাটল
ধরে৷
এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে
মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন
তাজউদ্দীন আহমদ৷ তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে
বিশ্বাস করতেন৷ তিনি ছিলেন
মনে প্রাণে দেশ প্রেমিক৷ চাইতেন না কোনোদিনই তাঁকে
জড়িয়ে এমন কোনো বিতর্কের
সৃষ্টি হোক যা থেকে জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কোনো
ক্ষতি হয়৷ আর তাই একাত্তরের
রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতা মন্ত্রীসভা থেকে
বিদায় নিলেন স্বাধীনতা লাভের
মাত্র ২ বছর ১০ মাসের মাথায়৷
যে নেতা দেশের জন্য পরিবার পরিজন ভুলে গিয়েছেন৷
১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ে নিজ হাতে
মৃতদেহ টেনেছেন৷ ১৯৭১-এ মুক্তিবাহিনীকে সাংগঠনিক
নেতৃত্ব দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর
আদর্শের সাথে একাত্ম থেকেছেন, তাঁকেই শেখ মুজিবের
নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয়৷
তিনি ছিলেন একজন আদর্শবাদী নেতা৷ আদর্শই তাঁর কাছে
ছিল বড়৷ পদত্যাগেও তাই
ব্যক্তি নয় নীতিগত বিষয়ই ছিল প্রধান৷
সুদর্শন ও ভদ্র ব্যবহারের এ মানুষটি রাজনৈতিক নেতা
সুলভ কর্কশ কন্ঠের বদলে ছিলেন
শান্ত ও কোমল ব্যবহারের অধিকারী৷ নিতান্ত সাধারণ
পোশাকের আর মোটা ফ্রেমের
চশমা পরা এই অসাধারণ মানুষের জীবনে শৌখিনতা বা
বিলাস বলতে যেটুকু ছিল তা
তাঁর ভাষায়- 'আমার আর কিছু না থাক চুল আঁচড়াবার
বিলাশ আছে৷ হোক সামান্য, তবুতো
বিলাশ৷' (তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১ম খন্ড)
পরবর্তী জীবনে চুলে সুগন্ধী
ব্রিল ক্রিম ব্যবহার করেছেন৷
দৃপ্ত পায়ে, সারাদেশে রাজনৈতিক তত্পরতায় ব্যস্ত
মানুষটিকেই আবার দেখা যায়
কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়ার লালন আখড়ায় বাউল পরিবেষ্টিত
মরমি গানের সমঝদার রূপে৷ এ এক
অন্য অনন্য দৃশ্যকল্প৷
ইতিহাস তার নিজস্ব নির্মাণের ক্রমধারার মাঝে কিছু
ফাঁকা স্থান রেখে যায়, তা যদি
সঠিকভাবে পূর্ণ হতো তাহলে ট্রাজেডি নামক শব্দটার
সৃষ্টি হতো না৷ যুদ্ধ পরবর্তী
বঙ্গবন্ধু সরকার থেকে পদত্যাগ করা তাজউদ্দীন আহমদ আর
পূর্ববর্তী তাজউদ্দীন আহমদের
মাঝের সেই শূন্যস্থান ইতিহাস কার ব্যর্থতায় পূরণ করতে
পারেনি তা আজও প্রশ্ন৷ তা
যদি সঠিকভাবে পূর্ণতা পেত, তবে স্বাধীনতা পরবর্তী
ইতিহাস হয় তো হতো অন্য রকম৷
১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষে তিনি জানতে পারেন
যে, সেনাবাহিনীর মাঝে একটি
গ্রুপ রয়েছে যারা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি চরম
অসন্তুষ্ট৷ তারা তাঁকে মেরে
ফেলার পরিকল্পনা করছে৷ ঐ রাতেই শেখ মুজিবকে নিজে
গিয়ে সচেতন করেন তাজউদ্দীন৷
তাঁর আশঙ্ক্ষাকে সত্য করে দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট
শেখ মুজিবুর রহমানকে
স্বপরিবারে হত্যা করা হয়৷ এ ভয়াবহ রূঢ়, নৃশংস ঘটনায়
সবাই স্তম্ভিত৷ ঘটনার
বীভত্সতায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'বঙ্গবন্ধু জেনেও
গেলেন না তাঁর শত্রু কে আর
বন্ধু কে? তিনি বন্ধুকে চিনতে পারলেন না৷' তাজউদ্দীন
আহমদের আক্ষেপ ছিল শেখ
মুজিবুর রহমান তাঁকে কখনও নিভৃতে জিজ্ঞাসা করেননি
স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসের কথা৷
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সবাই তাজউদ্দীন আহমদকে
আত্মগোপনে যাবার জন্য বলতে
থাকেন৷ কেননা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে পরবর্তী লক্ষ্য
হবেন তাঁর কাছের মানুষরা৷ কিন্তু
তিনি আত্মগোপন করতে অস্বীকৃতি জানান৷
অবশেষে সবার আশঙ্ক্ষাই সত্য হয় ৷ ১৫ আগস্ট প্রথম
গৃহবন্দী ও পরে ২২ আগস্ট গ্রেফতার
করা হয় তাঁকে৷ পরিবারের সদস্যদের প্রতি শুধু বলে
গেলেন- 'ধরে নাও আজীবনের জন্য
যাচ্ছি৷' দৃঢ়তার প্রতীক তিনি৷ ৩ কন্যা, ১ পুত্রসহ
স্ত্রীকে ছেড়ে যাবার সময় একটুও
বিচলিত ছিলেন না তিনি৷ ভুল বোঝাবুঝির অন্তর্দহনে
দগ্ধ তাঁর হৃদয়৷ কিন্তু অন্যায়ের
কাছে মাথা নত না করা দর্পিত পদক্ষেপ৷
কারা অন্তরীণ তিনিসহ আরও ৩ জাতীয় নেতা৷ সৈয়দ
নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর
আলী, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান৷ জেলে বসে অপেক্ষা
করতে থাকেন পরবর্তী দৃশ্য কল্পের৷
তাজউদ্দীন আহমদ জেলে স্বেচ্ছায় কাঠ কাটেন, ফুল গাছ
লাগান; নিজ হাতে কাপড়
পরিষ্কার করেন, আর রাতে বসে লিখতে থাকেন
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক ডায়েরি৷
স্ত্রীকে তিনি বারবার বলে গেছেন কালো বর্ডার দেয়া
লাল মলাটের সেই ডায়েরির
কথা৷ কিন্তু সে ডায়েরি আর বাঙালি জাতির হাতে
আসেনি৷ জাতি বঞ্চিত হয়েছে
ধাত্রীর কাছ থেকে দেশের জন্মকথার অনেক অজানা সত্য
জানতে৷ কারাগারে সেনা
সদস্যদের আনাগোনা বাড়তে থাকে৷ তাঁর কাছে আর
কারাগারকে নিরাপদ মনে হয় না৷
শঙ্কা সত্য হয়৷ ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অস্ত্রের দমকে
স্তব্ধ করে দেওয়া হয় ৪ নেতার
জীবন ও শরীর৷ সে আর এক লজ্জাজনক, বেদনা-বিধুর
ঘটনা৷ নিহত হন বাঙালি জাতির
স্বাধীনতার কান্ডারীরা৷
৪ নভেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যার স্থানেই পড়ে থাকে
মৃতদেহ৷ পরিবারকে খবর দেয়া
হয় ৩৬ ঘন্টা পর আর রাতে জেলগেটে আত্মীয়দের হাতে
মৃতদেহ তুলে দেয়া হয়৷ দাফন
করা হয় বনানী গোরস্থানে৷
১৯৭১-এ কারা অন্তরীন শেখ মুজিবুর রহমান শূন্য বিশাল
যুদ্ধক্ষেত্রে দখলদার বাহিনীর
সাথে যুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সরকার গঠন এবং
পরিচালনা, একই সঙ্গে নিজের
দলের লোকজনের আত্মঘাতী আক্রমণ মোকাবেলা করেছেন,
কিন্তু জর্জরিত হয়েছেন
অন্তর্ঘাতে৷ আহত হয়েছেন তাদের আঘাতে যারা তাঁর
কর্তব্য সম্পাদনের প্রতি নিষ্ঠাকে
স্বার্থপরতার অজুহাতে সিক্ত করার অপচেষ্টা করেছে৷
কর্মময় জীবনে কোনো কাজেই দাবি করেননি নিজ
কৃতিত্বের৷ কর্তব্য বিবেচনা করে
নিঃস্বার্থভাবে, একাগ্রচিত্তে কাজ করে গেছেন৷
বলেছেন- 'মুছে যাক আমার নাম কিন্তু
বেঁচে থাক বাংলাদেশ৷'
শত বছরে কিছু মহান দায়িত্ব পালনের জন্য সময় কিছু
মহান ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব
অর্পণ করে৷ নিঃসঙ্গ সারথী তাজউদ্দীন আহমদ সময়ের
খুঁজে বের করা এমন একজন সুমহান
ব্যক্তিত্ব, যিনি না থাকলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের
গৌরবময় সময়ের ইতিহাস হয়ত লেখা
হতো অন্যভাবে৷
সংক্ষিপ্ত জীবনী:
নাম: তাজউদ্দিন আহমদ
জন্ম: কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৩
জুলাই জন্মগ্রহণ করেন৷
মা ও বাবা: মা মেহেরুন্নেসা খানম এবং বাবা মৌলবি
ইয়াসিন খান৷
পড়াশোনা:
তাজউদ্দীন আহমদের পড়াশোনা শুরু বাবার কাছে আরবি
শিক্ষার মাধ্যমে, একই সময়ে ১ম
শ্রেণীতে ভর্তি হন বাড়ির দুই কিলোমিটার দূরের
ভূলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ ১ম ও
২য় শ্রেণীতে ১ম স্থান অর্জন করেন৷ ৪র্থ শ্রেণীতে
ভর্তি হন বাড়ি থেকে প্রায় ৫
কিলোমিটার দূরের কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ স্কুলে৷
মা'র প্রচেষ্টা ছিল ছেলেকে
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে লেখাপড়া করানোর৷ সফল হন
তিনি৷ এরপর বিদ্যালয় পরিবর্তনের
ধারাবাহিকতায় পড়েছেন কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস
ইনস্টিটিউশন, ঢাকার মুসলিম বয়েজ
হাই স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে৷ এসময় একজন
স্কাউট হিসেবে স্কাউট আন্দোলনের
সাথে যুক্ত হন৷ পরবর্তী কর্মজীবনে যা তাঁর প্রেরণা ও
কাজ করার ক্ষমতা জুগিয়েছে৷
এসম্পর্কে তিনি বলেছেন - 'স্কাউট হিসেবে শিক্ষা,
স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাকে
অমানুষিক পরিশ্রম করতে প্রেরণা ও ক্ষমতা জুগিয়েছে৷'
এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সময় সিভিল ডিফেন্স-এর ট্রেনিং নিয়েছিলেন তিনি৷
এম.ই স্কলারশিপ পরীক্ষায় ঢাকা জেলায় প্রথম স্থান
লাভ করেন৷ শুধু তাই নয় প্রতিভার
স্বাক্ষর রাখেন মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায়৷ ১৯৪৪ সালে এই
পরীক্ষায় অবিভক্ত বাংলায়
দ্বাদশ স্থান লাভ করেন তিনি ৷ এ সময়ই জড়িয়ে পড়েন
মুসলিম লীগের রাজনীতির
সাথে৷ হয়ে ওঠেন পার্টির সক্রিয় সদস্য৷ এবছর
নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের
কাউন্সিলর নির্বাচিত হন৷ যদিও মুসলিম লীগের
গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির প্রতিবাদে,
পরবর্তীতে দলের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন৷ একই
বছর কলকতায় শেখ মুজিবুর
রহামনের সাথে পরিচয় হয় তাঁর৷ ভালো পড়াশোনার
ধারাবাহিকতা বজায় ছিল উচ্চ
মাধ্যমিকেও৷ ঢাকা বোর্ডে অর্জন করেন ৪র্থ স্থান এবং
ভর্তি হন ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ উচ্চ শিক্ষায় তাঁর বিষয় ছিল
অর্থনীতি৷ এমনই মেধা-উজ্জ্বল শিক্ষা
জীবনের ধারক ছিলেন এ অনন্য ব্যক্তিত্ব৷
বিয়ে: ১৯৫৯ সালের ২৬ এপ্রিল সৈয়দা জোহরা খাতুন
লিলির সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ
হন তিনি৷ বিয়ের অলংকার ছিল বেলী ফুলের মালা৷ তাঁর
স্নিগ্ধ চেতনা আর মানসিকতার
সুগন্ধই বহন করছিল মালার শুভ্র বেলী ফুলগুলো৷
ছেলেমেয়ে: ৩ কন্যা ও ১ পুত্র৷
রাজনৈতিক জীবন: ১৯৪৮ এ প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলা
ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা
হয়েছিলেন তিনি৷ ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের
উদ্যোক্তাদের একজন৷ ১৯৫৩
সাল৷ 'আওয়ামী মুসলীম লীগ' দলের কাউন্সিলে
আনুষ্ঠানিকভাবে 'মুসলিম' শব্দটি দলের
নাম থেকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেয়৷ শেখ মুজিবুর
রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক
নির্বাচিত হন৷ এ সময়ই আওয়ামী লীগে সক্রিয়ভাবে যোগ
দেন তাজউদ্দীন আহমদ৷ এ
বছরই তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ
সম্পাদক হন৷ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে
ঢাকা উত্তর-পূর্ব আসনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হন
তাজউদ্দীন৷ প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগের পূর্ব
পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ নেতা ফকির
আব্দুল মান্নানকে ১৩ হাজার
ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেন৷ তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯
বছর৷ ১৯৬৪ সালে সাংগঠনিক
সম্পাদক হন আওয়ামী লীগের৷ ৬ দফার ঐতিহাসিক '৬৬
সালে হন সাধারণ সম্পাদক৷ শেখ
মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে
শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০
এপ্রিল সরকার গঠন করেন ও ১৭
এপ্রিল মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলার আম্রকাননে শপথ
গ্রহণ করেন৷ দেশ স্বাধীনের পর
শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলে মন্ত্রী পরিষদ
শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন
করা হয়৷ তাজউদ্দীন আহমদ হন নয়া সরকারের অর্থ ও
পরিকল্পনা মন্ত্রী৷ ১৯৭৩-এ
ঢাকা-২২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন৷ এক
পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের
নির্দেশে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন তাজউদ্দীন
আহমদ৷
মৃত্যু: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর৷
তথ্যসূত্র:
১. ইতিহাসের পাতা থেকে - সিমিন হোসেন রিমি।
২. আলোকের অনন্তধারা - সিমিন হোসেন রিমি।
৩. তাজউদ্দীন আহমেদের ডায়রী।
৪. জাতীয় চার নেতা স্মারক গ্রন্থ।
৫. তিন নভেম্বর জেলের পাগলা ঘন্টা - এ্যাড.
মোখলেসুর রহমান।
৬. মূলধারা '৭১ - মঈদুল হাসান।
৭. আত্মকথা '৭১ - নির্মলেন্দু গুণ।
৮. বাংলাপিডিয়া।
৯. দু'শো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা - মুক্তিযোদ্ধা
মুহাম্মদ নুরুল কাদির।
১০. পলাশী প্রান্তর থেকে বাংলাদেশ - খুরশীদ আলম
সাগর।
১১. দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান - লে. জে.
এ. কে. নিয়াজী।
১২. তাজউদ্দীন আহমদ নিঃস্বঙ্গ সারথী - ভিডিও
চিত্র।
১৩. সিমিন হোসেন রিমির সাক্ষাৎকার।
লেখক : রাজিত আলম পুলক
|