| ১৯৪১ সালে বোম্বেতে গিয়ে তিনি কর্মজীবনের শুরুতে
বোম্বাই রেডিওতে প্রোগ্রাম
করতেন এবং একটি স্কুলে রবীন্দ্র সংগীত শেখাতেন।
কৃষ্ণচন্দ্রদের সাথে তিনি
'তামান্না' নামে একটি সিনেমাতেও অভিনয় করেন।
বোম্বাই জীবন তাঁর ভালো লাগেনি।
২২ শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকীতে বাঙ্গালী
ও গুজরাটী মেয়েদের নিয়ে
বোম্বাই রেডিওতে একটি প্রোগ্রাম করার পরই তিনি
বোম্বাই ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
বোম্বাই ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনে গিয়ে বন্ধু সুহাসের
বাড়িতে ওঠেন।
তখন গান্ধীজীর 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের হাওয়া ছড়িয়ে
পড়েছে চারদিকে।
রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দের স্ত্রী
সুলেখিকা রানী চন্দের ডাকে তিনি
তাঁদের সাথে আন্দোলনে একাত্ম হয়ে কাজ করার জন্য
আশ্রম ছেড়ে গ্রামে গ্রামে 'বন্দে
মাতরম' গান গেয়ে বেড়াতে শুরু করেন। বন্ধু সুহাস
গ্রেফতার হবার পর তাঁরা বোলপুরে
ফিরে আসেন। তাঁদের প্রতি গোয়েন্দা বিভাগের সজাগ
দৃষ্টি থাকায় একদিন অনিলচন্দ্র
তাঁকে কলকাতা ফিরে যাবার পরামর্শ দেন। আবদুল আহাদ
কলকাতায় ফিরে আসেন।
কলকাতায় ফিরে আসার পর কিছুদিন তিনি বেকার জীবন
যাপন করেন।
এসময় তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু সন্তোষ সেনগুপ্তের সহায়তায় হিজ
মাষ্টার্স ভয়েস গ্রামাফোন
কোম্পনীর কর্মকর্তা হেম সোমকে গান শোনাবার সুযোগ
পান। হেম সোম তাঁর গান শুনে
তাঁকে শুধু শিল্পী নয়, রবীন্দ্র সংগীতের প্রশিক্ষক
হিসাবেও তাঁর কোম্পানীতে নিয়োগ
দেন। আবদুল আহাদ প্রশিক্ষক জীবনের সূত্রপাত করেন সুধা
মুখার্জীকে দিয়ে 'বাদল ধারা
হলো সারা' ও গহন রাতে শ্রাবণ ধারা' এই গানদুটি
রেকর্ড করার মধ্যে দিয়ে।
তাঁর পরিচালনায় সুচিত্রা মিত্রের 'মরণ রে তুহূ মম
শ্যাম সমান' এবং 'হৃদয়ের একূল
ওকূল' এই দুটি রবীন্দ্র সংগীত বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত গায়ক
পংকজ কুমার মল্লিকের সাথে রবীন্দ্র সংগীত নিয়ে
বিশ্বভারতীর মনোমালিন্য হওয়ার
কারণে প্রায় দীর্ঘ ছয় বছর তিনি রবীন্দ্র সংগীত
রেকর্ডিং করা থেকে বিরত ছিলেন।
হেম সোম আবদুল আহাদকে দায়িত্ব দেন পংকজ কুমার
মল্লিককে দিয়ে তাঁদের কোম্পানী
থেকে রবীন্দ্র সংগীত রেকর্ড বের করার ব্যবস্থা করার।
আবদুল আহাদ অসাধ্য সাধন
করেন। তিনি পংকজ কুমার মল্লিককে রাজি করিয়ে 'সঘন
গহন রাত্রি' ও 'তুমি কি
কেবলি ছবি' গান দুটি রেকর্ড করান এবং বিশ্বভারতীর
মিউজিক বোর্ড থেকে পাস
করিয়ে আনেন।
আবদুল আহাদ তাঁর সংগীত গুরু শান্তি দেব ঘোষকে দিয়ে
'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি '
এবং 'বসন্ত কি শুধু ফুল ফোটার মেলা' রবীন্দ্র সংগীত
দুটি রেকর্ড করান। প্রসঙ্গত
উল্লেখ্য, এটি ছিল শান্তি দেব ঘোষের জীবনের
প্রকাশিত প্রথম রবীন্দ্র সংগীতের
রেকর্ড।
এছাড়াও এসময় সুচিত্রা মিত্রের অনুরোধে আবদুল আহাদ
তাঁর বাবা খ্যাতনামা লেখক
সৌরেন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায়ের গানে সুর দেন ও
রেকর্ডিং- এর ব্যবস্থা করেন। বন্ধু
সন্তোষ সেনগুপ্তকে দিয়ে আবদুল আহাদ তাঁর নিজের
সুরারোপিত প্রথম আধুনিক গানের
রেকর্ড এইচ. এম.ভি. থেকে প্রকাশ করেন। গান দুইটি
ছিল 'তুমি আমি দুই তীর সুগভীর
তটিনী' এবং 'সে পথ ধরে আসনি তুমি'।
কলকাতার কর্মজীবনের ফাঁকে ফাঁকে আবদুল আহাদ আড্ডা
জমাতেন বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত
গায়ক দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়িতে। সেখানে সুচিত্রা
মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে
নিয়ে দেবব্রত বিশ্বাস কমিউনিষ্ট পার্টির বিভিন্ন
প্রোগ্রামে অংশ নেবার জন্য
গানের রিহার্সেল দিতেন। উপমহাদেশের ইতিহাসে
১৯৪২-৪৩ সালের ঐ সময়টা ছিল খুব
গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে,
গান্ধীজী 'ভারত ছাড়'
আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, কলকাতায় বোমা পড়ছে আর
এরই ধারাবাহিকতায় দেখা
দিয়েছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। পিটিআই এর কর্মী হিসাবে
দেবব্রত বিশ্বাস সদলবলে গান
গেয়ে মানুষকে উজ্জ্বীবিত করে বেড়াতেন পথে প্রান্তরে।
তাঁর বাড়িতেই আবদুল আহাদ
তখনকার আলোড়ন সৃষ্টিকারী জ্যোতিরিন্দ্র নাথ মৈত্রের
'নবজীবনের গান' বিশেষ করে
দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে 'ফ্যান দে ' শুনে দেশপ্রেমে
অনুপ্রাণিত হন।
ঠিক সেসময়ই শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সেই
অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে
আবদুল আহাদকে তাঁর শিল্পী বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যয় ঢাকা
চলে যাবার পরামর্শ দেন।
ইতিপূর্বে আবদুল আহাদের পরিচালনায় হেমন্তের গাওয়া
'প্রাঙ্গনে মোর শিরিষ শাখায়'
গানটি রবীন্দ্র সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা
পেয়েছিল। হয়তো তাই ঢাকায়
চলে আসার আগে আবদুল আহাদের পরিচালনায় হেমন্ত
মুখোপাধ্যায় ৪টি রবীন্দ্র সংগীত
রেকর্ডিং করেন।
এরপর ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝিতে আবদুল আহাদ ঢাকায়
চলে আসেন। ঢাকা বেতারে
প্রয্রোজক হিসাবে যোগদান করেন। সেসময় রেডিওর
অবস্থা ছিল বড় করুণ। শিল্পী
সংখ্যা নগণ্য থাকায় একই শিল্পীকে দিয়ে সবধরনের গান
গাওয়ানো হতো। সংগীত
বিভাগে আরো তিনজন প্রযোজক থাকলেও মূল দায়িত্ব
অর্পিত হয় আবদুল আহাদের ওপর।
আবদুল আহাদ কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেন একক গানের
পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য
আনার জন্য সমবেত গানও করা দরকার। তিনিই প্রথম
রেডিওতে রবীন্দ্র - নজরুলের গান সমবেতভাবে প্রচারের
পাশাপাশি অন্যান্য সমকালীন
কবিদের দেশাত্মবোধক গান সমবেত
কন্ঠে প্রচারের উদ্যোগ নেন। সমবেত গানের জন্য তিনি
হোসনা বানু, আঞ্জুমানারা বেগম
প্রমুখকে নিয়ে একটি শিল্পী দলও তৈরি করেছিলেন।
১৯৫৪ সালে ঢাকায় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নৃত্য ও সংগীতের
মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই
মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বার্মা, পাকিস্তান ,
থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর,
ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে বিভিন্ন শিল্পীদের আমন্ত্রণ
জানানোর লক্ষ্যে তাঁকে
উল্লিখিত দেশসমুহ ভ্রমণ করতে হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি
স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে
একবছরের জন্য মাদ্রিদ যান স্প্যানিশ সংগীত সম্পর্কে
অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য।
স্পেন থেকে দেশে ফিরে তিনি দেশাত্মবোধক গানে
সুরারোপে মনোযোগী হন। তাঁর সুরে
আবু হেনা মোস্তাফা কামালের লেখা 'কেন যে আমার
কৃষ্ণচূড়ার বনে' 'আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি'
'ভ্রমরের পাখনা যতদূর যাক না'
গানগুলি ফেরদৌসী রহমানের
কন্ঠে অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ঢাকা টেলিভিশনের সিগনেচার টিউন করেছিলেন তিনি।
টেলিভিশনের প্রতিদিনের
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেটি বাজানো হতো।
১৯৬১ এর আন্দোলন মুখর উত্তাল রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক
আন্দোলনের সময়ে নতুন প্রেরণা ও
চেতনা নিয়ে রবীন্দ্রজন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করা হয়।
এ উপলক্ষ্যে অধ্যাপক রফিকুল
ইসলামের সহযোগিতায় আবদুল আহাদ টেলিভিশনে বাংলা
বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে
হাজার বছরের বাংলা গানের এক অনবদ্য অনুষ্ঠন
করেছিলেন।
১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিয়ে
গঠিত সাংস্কৃতিক দলের উপনেতা
হয়ে গণচীন ভ্রমণ করেন। ফিরে এসে সেই অভিজ্ঞতার
কথা নিয়ে লেখেন একটি অসাধারণ
গ্রন্থ - 'গণচীনে চব্বিশ দিন'।
এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সাংস্কৃতিক দলের উপনেতা হয়ে
ইরানের ইন্টারন্যাশনাল আর্ট
ফেস্টিভ্যালে যোগদান করেন।
ষাটের দশকে এদেশে রবীন্দ্রচর্চার প্রচার ও প্রসারে
তিনি প্রশংসনীয় ভুমিকা রাখেন।
সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক কারণে রবীন্দ্র সংগীতের
ওপর বার বার যে আঘাত
এসেছিল তা থেকে তিনি রেডিওকে সুকৌশলে বাঁচিয়ে
রাখতে সক্ষম হন।
কর্মজীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি রেডিওতে প্রযোজক-সুরকার
হিসাবে কর্মরত ছিলেন এবং
তাঁর চাকুরির বয়সসীমা পার হবার পরও সাতবার তা
বাড়ানো হয়েছিল। রেডিওর কাজের
বাইরে তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে গান
শেখাতেন এবং প্রচুর বই পড়তেন। |