‘তখন আমি কলেজে পড়ি। অন্ধকার রাতে চট্টগ্রামের একটি শ্মশানে মাস্টারদার
সঙ্গে প্রথম দেখা। একপর্যায়ে মাস্টারদা বললেন, তোমাকে বিপ্লবীদের দলে
নেওয়া যাবে না। এর চেয়ে বরং তুমি পড়ালেখা করে জজ-ব্যারিস্টার কিংবা
ডাক্তার-প্রকৌশলী হও। সেখান থেকেই দেশের সেবা করো। পরবর্তী সাক্ষাতেও
মাস্টারদা আমাকে দলে নেবেন না বলে জানিয়ে দেন।’
না, এখানেই গল্পের শেষ নয়। সেদিনকার সেই একাগ্র দেশপ্রেমিক ও সাহসী
যুবকটি বিপ্লবীদের দলে নাম লিখিয়েছিলেন। শুধু নাম লেখানো নয়, নিরীহ
ভারতীয়দের হত্যা ও দেশ দখলকারী ব্রিটিশদের মনে কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য
মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে জীবন বাজি রেখে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুটেও
অংশ নিয়েছিলেন। তিনি শতবর্ষী বিপ্লবী ও মাস্টারদার সহযোগী বিনোদবিহারী
চৌধুরী।
ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্র হয়েও কীভাবে বিপ্লবীদের দলে নাম লেখালেন সে
কথাই ০১ ফেব্রুয়ারি সোমবার এশিয়াটিক সোসাইটির মাসিক বক্তৃতায় এসে বর্ণনা
করলেন তিনি।
কীভাবে মাস্টারদার মন গলালেন? এ প্রসঙ্গে বিনোদবিহারী বললেন, ‘একপর্যায়ে
মাস্টারদার সঙ্গে রেগে গেলাম। তাঁকে বললাম, আপনিই কি ভারতীয় উপমহাদেশে
একমাত্র বিপ্লবী? অন্য দলও তো আছে। আমাকে না নিলে অন্যদের দলে যোগ দেব।
এরপরই মাস্টারদা আমাকে জড়িয়ে ধরে দলে নিয়েছিলেন।’
বিপ্লবীদের সংগ্রামের ফসল ভারতের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার স্বাদ পায়
বাংলাদেশ নামে বাঙালিদের ভূখণ্ডও। কিন্তু সব অর্জন কি হয়ে গেছে?
বিনোদবিহারী স্বগতোক্তির মতো প্রশ্ন করলেন নিজেকেই। আর উত্তরও দিয়েছেন
নিজেই, ‘১৯৪৭-এর স্বাধীনতা, আনন্দের বদলে দুঃখ দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা
ছড়িয়ে দিয়ে দেশকে টুকরো টুকরো করা হয়েছে, যা আমরা চাইনি। ১৯৭১ সালে
স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি। কিন্তু এখনো অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য মুক্তি আসেনি।
সাম্প্রদায়িকতা এখনো আছে।’
তবে আশাবাদী বিনোদবিহারী চৌধুরী বললেন, ‘নতুন প্রজন্মকে মাথা উঁচু করে
দাঁড়াতে হবে। ভয়, ভীরুতা ও কাপুরুষতা ঝেড়ে ফেলতে হবে। তাহলে দেশের মানুষ
আর ক্ষুধায় কাতরাবে না। সবাই শিক্ষা-চিকিত্সা পাবে।’ বিনোদবিহারী চৌধুরীর
বক্তৃতা শেষে তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন এশিয়াটিক সোসাইটির চেয়ারম্যান
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাহফুজা খানম। আইনমন্ত্রী
শফিক আহমেদ, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও
নাগরিক সমাজের লোকজন দর্শক সারিতে বসে বিনোদবিহারী চৌধুরীর বক্তৃতা শোনেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেদিনের বিপ্লবীরা বুঝতে পেরেছিলেন অস্ত্র দিয়ে
ব্রিটিশদের তাড়ানো সম্ভব নয়। এমন কিছু করতে হবে, যাতে তাদের মনে ভয় ঢুকে
যায়। এ ক্ষেত্রে মাস্টারদার নেতৃত্বে বিনোদবিহারী চৌধুরীরা সফল হয়েছিলেন।
প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী পটুয়া কামরুল হাসানের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী ০২ ফেব্রুয়ারি
মঙ্গলবার। এ উপলক্ষে পটুয়া কামরুল হাসান আর্ট স্কুল সকাল সাড়ে নয়টায় ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে শিল্পীর সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের ইতিহাসে পটুয়া কামরুল হাসান এক অবিস্মরণীয় নাম।
১৯৮৮ সালের ০২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি চত্বরে অনুষ্ঠিত
দ্বিতীয় জাতীয় কবিতা পরিষদ উত্সবের বিকেলের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা
অবস্থায় হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কামরুল
হাসানের আঁকা ইয়াহিয়ার দানবমূর্তি-সংবলিত পোস্টার ‘এই জানোয়ারদের হত্যা
করতে হবে’ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ও কথাশিল্পী জহির রায়হানের ৩৮তম অন্তর্ধান দিবস ৩০
জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে তিনি বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারের খোঁজে বের
হন। এর পর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরপর নিখোঁজ হন শহীদুল্লা কায়সার। ’৭২-এর এই দিনে জহির
রায়হানকে অজ্ঞাতনামা একজন ফোন করে জানায়, তাঁর ভাই মিরপুর বিহারি
ক্যাম্পে আটক আছেন। তাঁকে উদ্ধার করতে জহির রায়হান সেখানে গেলে পরে আর
তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মিরপুর অঞ্চলটি তখনো আটকে পড়া পাকিস্তানি ও সাদা পোশাকে পাকিস্তানি
সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করত। ধারণা করা হয়, জহির রায়হানকে মিরপুর
বিহারি ক্যাম্পে স্বাধীনতাবিরোধীরা হত্যা করে।
হাজার বছর ধরে, বরফ গলা নদী, শেষ বিকেলের মেয়ে প্রভৃতি জহির রায়হানের
উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তিনি স্টপ জেনোসাইড, জীবন থেকে নেয়া, লেট দেয়ার বি
লাইট—এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের নির্মাতা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি ২০১০ইং।
ছায়ানটে ওয়াহিদুল হক স্মরণ
‘শরীর চিরকাল থাকে না, লোপ পায়। কিন্তু ভাব থাকে। ভাবের মধ্য দিয়ে মানুষ
থেকে যায়, কর্ম থেকে যায়, স্মৃতি থেকে যায়। ঠিক তেমন করেই সশরীরে না
থেকেও থেকে গেছেন ওয়াহিদুল হক।’ গতকাল ছিল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল
হকের মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ছায়ানট মিলনায়তনে ছায়ানট আয়োজিত অনুষ্ঠানে
স্বাগত বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন আলোচক মফিদুল হক। স্মারক বক্তৃতায় তাঁর কথারই
পুনরাবৃত্তি ঘটালেন অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী। তিনি ওয়াহিদুল হকের জীবন,
কর্ম, রবীন্দ্রনাথ-প্রীতি এসব নিয়ে কথা বলেন।
সন্ধ্যা সাতটায় অনুষ্ঠান শুরুর কথা থাকলেও এর বেশ আগেই মিলনায়তন দর্শকে
পূর্ণ। মঞ্চের সামনে ওয়াহিদুল হকের একটা বড় ছবি। আশপাশজুড়ে ফুল আর ছোট
গাছের টব। আলোক প্রক্ষেপণে মনে হয় যেন সেই ছবি থেকে দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সমবেতভাবে ছায়ানটের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করেন ‘বাজাও
তুমি কবি’ গানটি। এর পরই ছিল বক্তৃতাপর্ব। এর পর নৃত্য। ‘আছে দুঃখ আছে
মৃত্যু/বিরহ দহন লাগে তবু শান্তি/তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে’ গানের সঙ্গে
শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পাঁচ শিল্পীর নাচ মুগ্ধ করে সবাইকে। নাচের
সঙ্গে গানটি গেয়েছিলেন বুলবুল ইসলাম ও মিতা।
নাচ শেষে ‘তোমারে জানি নে হে’ গান গেয়ে শোনান ইলোরা আহমেদ। তারপর
কেবল গান আর গান। মাঝখানে সামিনা হোসেনের ‘ধায় যেন মোর সকল
ভালোবাসা’ গানের সঙ্গে নাচ। পরে নাসির উদ্দিন ও জহিরুল হকের রবীন্দ্রনাথ
থেকে পাঠ। ওয়াহিদুল হক স্মরণের এই আয়োজনে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মেলক
কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘শ্রাবণের ধারার মত’, ‘তোমার প্রেমে ধন্য করো’।
এ ছাড়া ইফফাত আরা দেওয়ান, লাইসা আহমেদ, চন্দনা মজুমদার, তানিয়া
মান্নান, নাসিমা শাহীন, অসীম দত্ত, নিলোত্পল সাধ্য, বিমানচন্দ্র বিশ্বাস ও
সুমন চৌধুরী একক গান পরিবেশন করেন। সবশেষে শিল্পীরা একসঙ্গে জাতীয়সংগীত
গেয়ে শ্রদ্ধা জানান।
শিক্ষা গ্রহণে উত্সাহিত করতে ‘কেউ রবে না বাইরে’পাশাপাশি দুটি গ্রাম।
দীর্ঘদিন থেকে এই দুই গ্রামের মধ্যে চলতে থাকা শত্রুতায় নতুন মাত্রা যুক্ত করে
একটি পুরাকীর্তি। উত্তরখান গ্রামে একটি পুরাকীর্তি আবিষ্কৃত হলে গ্রামবাসী
আনন্দে মেতে ওঠে। অন্যদিকে হতাশায় ভেঙে পড়ে দক্ষিণখান গ্রামবাসী। তারা
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর উপায় হিসেবে শতভাগ ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করার
পরিকল্পনা নেয়। এভাবেই নাটক ‘কেউ রবে না বাইরে’র গল্প এগোতে থাকে।
বিনোদনের মাধ্যমে এ নাটকে সবার উদ্দেশে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ
করা হয়েছে। এটি লিখেছেন লেখক ও নাট্যকার আনিসুল হক। ইউনিসেফের
সহযোগিতায় এটি নির্মাণ করেন ফরিদুর রহমান। গতকাল বুধবার জাতীয়
প্রেসক্লাবের হলরুমে নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক
ইউনিসেফ। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন,
বিশেষ অতিথি প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের
সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফের
প্রতিনিধি ক্যারল ডি রয়, নাট্যকার আনিসুল হক, নির্মাতা ফরিদুর রহমান,
অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক
শ্যামল কান্তি ঘোষ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইউনিসেফের কর্মকর্তা সাঈদুল হক।
২৬ পর্বের এ নাটকে অভিনয় করেন মামুনুর রশীদ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, পীযূষ
বন্দ্যোপাধ্যায়, ওয়াহিদা মল্লিক, এজাজুল ইসলাম, নাজনীন, আনিসুর রহমান,
নাদিয়া ও আরও অনেকে। এটি প্রচার করবে বিটিভি। প্রথম পর্ব প্রচারিত হবে
২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ জানুয়ারী ২০১০ইং
চলে গেলেন বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব সাঈদ আহমেদ
বরেণ্য নাট্যকার সাঈদ আহমদ আর নেই। তিনি ২১ জানুয়ারী ভোর পাঁচটা ৫০
মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল
করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
সাঈদ আহমদ ১৯৩১ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৪ থেকে
১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বিবিসিতে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময় তিনি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ
করেন। আশির দশকে সাঈদ আহমদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিশ্বনাটক নামের একটি
নাট্যবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। বিশ্বনাটক অনুষ্ঠানটি সাধারণ দর্শকমহলে
ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৫), সুফি
মোতাহার হোসেন পুরস্কার (১৯৭৮), জার্মানির ট্রাস্টেল অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৩) ও
ফ্রান্সের লিজিওন দ্য অনার (১৯৯৩) অর্জন করেন।
সাঈদ আহমদের উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে, কালবেলা (১৯৬২),
মাইলপোস্ট (১৯৬৪), তৃষ্ণায় (১৯৬৯), প্রতিদিন একদিন (১৯৭৫) এবং শেষ নবাব
(১৯৮৭)।
পেশাগত জীবনে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত
সচিব ছিলেন।